পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু জায়গায় অক্সিজেনের ঘাটতি, প্রচণ্ড ঠান্ডা, তীব্র সৌর বিকিরণ এবং খাদ্যের অভাব- সব মিলিয়ে জীবন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবু আন্দিজ পর্বতমালার অ্যান্ডিয়ান লিফ-ইয়ার্ড মাউস অবলীলায় বাস করে প্রায় ৬,৭৩৯ মিটার উচ্চতায়। এই অসাধারণ অভিযোজনের পেছনে রয়েছে শরীরের তাপ উৎপাদন, অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা এবং বিষাক্ত পদার্থ নিষ্ক্রিয় করার একাধিক জৈব কৌশল। ২০২০ সালে আর্জেন্টিনা-চিলি সীমান্তের ভলকান লুল্লাইয়াকো আগ্নেয়গিরির চূড়ায় এই ইঁদুরকে দেখতে পাওয়া যায়। এত উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র ৪৪ শতাংশ। গবেষকেরা বিভিন্ন উচ্চতায় বসবাসকারী এই ইঁদুরের তুলনা করে দেখেছেন, উঁচু এলাকার ইঁদুরগুলো কম অক্সিজেনেও শরীরের তাপ উৎপাদনে অনেক বেশি দক্ষ। তাদের পেশি ও ব্রাউন অ্যাডিপোজ টিস্যু (বাদামি চর্বি কোষকলা) অনেক বেশি সক্রিয়, যা শরীর গরম রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া এত কম অক্সিজেনের পরিবেশেও এরা শক্তির উৎস হিসেবে প্রধানত চর্বি ব্যবহার করে। সাধারণত চর্বি থেকে শক্তি উৎপাদনে বেশি অক্সিজেন লাগে, তাই বিজ্ঞানীদের ধারণা, উচ্চভূমির প্রাণীরা কার্বোহাইড্রেটের ওপরেই বেশি নির্ভর করবে। কিন্তু এই ইঁদুর সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। তাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বা অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা নীচু এলাকার ইঁদুরের তুলনায় খুব একটা আলাদা নয়। পরিবর্তে, কার্বনিক অ্যানহাইড্রেজ নামে একটি উৎসেচকের কার্যকারিতা কম, যা শরীরে কার্বন ডাই-অক্সাইড ধরে রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে দ্রুত শ্বাস নেওয়ার পরও রক্ত অতিরিক্ত ক্ষারীয় হয়ে পড়ে না। জিন বিশ্লেষণ করে আরও জানা গেছে, উচ্চভূমির ইঁদুরে এমন অনেক জিনের পরিবর্তন ঘটেছে, যা তাপ উৎপাদন, চর্বির বিপাক, রক্তনালির গঠন এবং কম অক্সিজেনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়। মানুষের মতোই অক্সিজেনের স্বল্পতা-প্রণোদিত ক্রিয়ার সঙ্গে কয়েকটি জিনও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে শুধু অক্সিজেনের ঘাটতি নয়, বিষাক্ত উদ্ভিদ ও আগ্নেয়গিরির পরিবেশে থাকা ভারী ধাতু প্রভৃতি বিষাক্ত পদার্থের সঙ্গেও অভিযোজন ঘটেছে এই ইঁদুরের। বিষাক্ত পদার্থ ভাঙতে সাহায্যকারী একাধিক জিনেরও বিবর্তন ঘটেছে, যদিও বিভিন্ন উচ্চতায় সেগুলির কার্যকারিতায় পার্থক্য দেখা যায়। অক্সিজেনের স্বল্পতা ও বিষাক্ত পরিবেশ- এই দু ধরনের চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করার ক্ষমতাই অ্যান্ডিয়ান লিফ-ইয়ার্ড ইঁদুরদের পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চ স্থান নিবাসী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের অন্যতম করে তুলেছে। এই গবেষণা ভবিষ্যতে উচ্চতাজনিত শারীরবৃত্তীয় অভিযোজন এবং মানবস্বাস্থ্যের গবেষণায়ও নতুন দিশা দেখাতে পারে।
সূত্র: Science ; July ; 2026
