আমেরিকায় ‘পিতৃত্বকালীন মৃত্যু’ সমস্যা

আমেরিকায় ‘পিতৃত্বকালীন মৃত্যু’ সমস্যা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ মে, ২০২৬

সন্তান জন্মের পর মায়েদের মৃত্যু এক দীর্ঘ চর্চিত বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা অনেকদিন এ বিষয়ে চর্চা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এই নিয়ে আলোচনা, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণ হয়েছে। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে, সন্তানের জন্মের পর প্রথম কয়েক বছরে বহু পিতার মৃত্যু হয়, অথচ এই সমস্যা নিয়ে কার্যত কোনো জাতীয় নজরদারি বা স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই। বিষয়টি প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিতই রয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলছেন, এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক বিপজ্জনক অন্ধ দিক। গবেষণাটির সম্পূর্ণ বিবরণ সম্প্রতি জেএএমএ পেডিয়াট্রিক্সে প্রকাশিত হয়েছিল।

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণায় জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে ২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর ২০২২ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে দেখা হয়, ওই শিশুদের কতজনের বাবা মারা গেছেন। বেশ উদ্বেগজনক ফলাফল ছিল। পাঁচ বছরের মধ্যে ৭৯৬ জন বাবার মৃত্যু হয়েছে, যার প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল প্রতিরোধযোগ্য। অর্থাৎ, উপযুক্ত সামাজিক সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্য পরিসেবা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে হয়তো অনেক মৃত্যুই এড়ানো যেত।

যা দেখা গেল, এই মৃত্যুর বড় অংশ ঘটেছে আত্মহত্যা, মাত্রাতিরিক্ত মাদকাসক্তি, হত্যাকাণ্ড এবং দুর্ঘটনার কারণে। গবেষকদের মতে, এগুলো কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; এগুলি হল সমাজের গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকটের প্রতিফলন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ, সহিংস পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সদ্য পিতাদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

গবেষণার প্রধান লেখক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রেইগ গারফিল্ড বলেন, হাসপাতালের নবজাতক পরিচর্যা বিভাগে কাজ করার সময় তিনি বহু মাকে সদ্য সন্তান জন্মের পর সঙ্গীর আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়তে দেখেছেন। কখনও গুলিতে, কখনও সড়ক দুর্ঘটনায়, আবার কখনও আত্মহত্যা বা মাদকাসক্তির কারণে তাদের সঙ্গী মারা গেছেন। অথচ এই ধরনের পিতৃমৃত্যু নিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রায় কোনো আলোচনাই নেই।

তবে গবেষণায় একটি ইতিবাচক দিকও দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে বাবাদের মৃত্যুহার, যেসব পুরুষ বাবা নন তাদের তুলনায় কম ছিল। অর্থাৎ, বাবা হওয়া অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনে দায়িত্ববোধ, নতুন উদ্দেশ্য এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের প্রবণতা তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ৩০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী বাবাদের মৃত্যুহার ছিল প্রতি এক লাখে ১২০ জন, যেখানে একই বয়সী বাবা নন এমন পুরুষদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ২৩১ জন।

তবে ঝুঁকি সবার জন্য সমান ছিল না। অবিবাহিত, গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী, কম শিক্ষিতদের, সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল বাবাদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি। বিশেষ করে তরুণ বয়সী বাবাদের মধ্যে অস্বাভাবিক বা সহিংস মৃত্যুর হার বেশি দেখা গেছে।

গবেষকদের দাবি, মাতৃমৃত্যুর মতো পিতৃমৃত্যুকেও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একজন বাবার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের আয়ের উৎস হারানো নয়; এটি একটি শিশুর মানসিক বিকাশ, তার গোটা ভবিষ্যৎ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পুরো পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য , সমাজ এখনও নতুন বাবাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না। পিতৃত্বকালীন মৃত্যুর জাতীয় বিশ্লেষণ বর্তমানে সম্ভব নয়। জন্ম এবং মৃত্যুর তথ্য রাজ্যগুলি দ্বারা সংগ্রহ করা হয়, তবে যখন তথ্যটি জাতীয়ভাবে সংকলিত হয়, তখন ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তযোগ্য বিবরণ সরিয়ে রাখা হয়। ফলে মৃত্যুর পৃথক কারণ এবং অন্যান্য অনেক মূল কারণ নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে যায়। গারফিল্ড এবং তাঁর দল একটি বিদ্যমান প্রকল্প, প্রেগন্যান্সি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট মনিটরিং সিস্টেম ফর ড্যাডস-এর মাধ্যমে জর্জিয়ার উপাত্ত ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটি তাঁরাই তৈরি করেছিলেন প্রথম 2018 সালে জর্জিয়ায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে।

গারফিল্ড আশা করেন তাঁর গবেষণার ফলাফলগুলি অন্যান্য রাজ্যগুলিকে তাদের নিজস্ব তথ্য পরীক্ষা করতে, পিতৃত্বকালীন মৃত্যুর একটি পরিষ্কার রাজ্য-ভিত্তিক চিত্র তৈরি করতে এবং শেষ পর্যন্ত এই সংকটের বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে বোঝার ক্ষেত্রে একত্রে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।

 

সূত্র: “Paternal Mortality During Early Childhood” by Craig F. Garfield, Clarissa D. Simon, Chris Harrison, Michael Woods, Katy Bedjeti and John T. Carter, 4 May 2026, published in JAMA Pediatrics. DOI: 10.1001/jamapediatrics.2026.1217

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six − 2 =