কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বানানো ভুয়ো ভিডিওগুলো এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে, অনেক সময় আসল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা মোকাবিলায় এবার আলোর পদার্থবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হল এক নতুন প্রযুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস এঞ্জেলসের গবেষকেরা এমন একটি আলোকভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা সর্বোচ্চ ৯৭.৮ শতাংশ নির্ভুলতায় ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় কম শক্তি খরচ করে এটি একই সঙ্গে ১৫ টি বা তার বেশি ভিডিও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।
প্রথম দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ভিডিওতে হাতের আঙুলের সংখ্যা ভুল হওয়া কিংবা লেখায় অসংলগ্নতা-সহ নানা ত্রুটি দেখা যেত। কিন্তু আধুনিক জেনারেটিভ AI প্রযুক্তি, বিশেষত ডিফিউশন মডেল, এখন অনেক বেশি নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত ভিডিও তৈরি করতে পারে। ফলে মানুষের পক্ষেও এই ধরনের ভিডিও শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠেছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ গড়ে মাত্র প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ডিপফেক শনাক্ত করতে পারে। ভুয়ো তথ্য ছড়ানো, পরিচয় বিকৃত করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করার আশঙ্কা বাড়ায় দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বাড়ছে।
বর্তমানে ডিপফেক/কৃবুর তৈরি ভুয়ো ভিডিও শনাক্ত করতে ব্যবহৃত অধিকাংশ ব্যবস্থা জটিল নিউরাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। এগুলি প্রচুর গণনাশক্তি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। পাশাপাশি, ভিডিওতে সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার মতো প্রতিপক্ষীয় আক্রমণের ঝুঁকিও রয়েছে।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে গবেষকেরা আলোর ভৌত বৈশিষ্ট্যকেই গণনার কাজে লাগিয়েছেন। তাঁদের তৈরি ব্যবস্থায় প্রথমে একটি হালকা ডিজিটাল এনকোডার , ভিডিওটির স্থানিক ও কালিক বৈশিষ্ট্য সংগ্রহ করে। এরপর সেই তথ্যকে আলোর তরঙ্গের একটি বিশেষ বিন্যাসে রূপান্তরিত করা হয়। এই আলোকতরঙ্গ একটি অপটিক্যাল ডিকোডারের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর বিশেষ ডিটেক্টর ভিডিওটির সত্যতা সম্পর্কে একটি স্কোর তৈরি করে।
Celeb-DF ডেটাবেসের মুখবদল করা ও আসল ভিডিও পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ব্যবস্থাটি একসঙ্গে ১৫টি ভিডিও বিশ্লেষণ করে গড়ে ৯৭.৭৯ শতাংশ নির্ভুলতা অর্জন করেছে। নকল ভিডিও শনাক্ত করার সংবেদনশীলতা ছিল ৯৯.৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে, Google-এর VEO-3 মডেলে তৈরি ভিডিও শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নির্ভুলতা ছিল ৯৪.৮০ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ছবির কম্প্রেশন, শব্দজনিত বিঘ্ন, যন্ত্রের সামান্য অবস্থানগত পরিবর্তন এবং প্রতিপক্ষীয় আক্রমণের বিরুদ্ধেও যথেষ্ট প্রতিরোধী। ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুলসংখ্যক ভিডিও দ্রুত প্রাথমিকভাবে যাচাই করতে এটি কাজে লাগতে পারে। সন্দেহজনক ভিডিওগুলিকে পরে আরও উন্নত ডিজিটাল ব্যবস্থার সাহায্যে পরীক্ষা করা হবে। বৃহত্তর পরিসরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন ধরনের কৃবু-নির্মিত ভিডিও শনাক্ত করার উপযোগী করে তোলাই এখন গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য।
সূত্র: To detect deepfake videos, researchers turn to the physics of light, 21 Oct 202, physics world.
