উদ্ধার হল আর্কিমিডিসের পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা

উদ্ধার হল আর্কিমিডিসের পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১০ জুলাই, ২০২৬

প্রাচীন গণিতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার সম্প্রতি গবেষকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বহু দশক ধরে নিখোঁজ বলে বিবেচিত আর্কিমিডিস প্যালিম্পসেস্টের একটি হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা অবশেষে ফ্রান্সের ব্লোয়া শহরের একটি সংগ্রহশালায় খুঁজে পাওয়া গেছে। এটি মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ আর্কিমিডিসের অজানা বা আংশিকভাবে হারিয়ে যাওয়া চিন্তাধারাকে পুনরায় উন্মোচনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।

আর্কিমিডিস প্যালিম্পসেস্ট হলো দশম শতাব্দীর একটি গ্রিক পাণ্ডুলিপি, যেখানে সিরাকিউজের বিখ্যাত গণিতবিদ ও বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা সংরক্ষিত ছিল। তবে মধ্যযুগে পার্চমেন্ট বা পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি লেখার উপকরণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় পুরনো লেখা মুছে তার উপর নতুন ধর্মীয় লেখা লেখা হতো। এই পুনর্ব্যবহৃত পাণ্ডুলিপিকেই বলা হয় “প্যালিম্পসেস্ট”। ফলে আর্কিমিডিসের মূল লেখাগুলি অনেকাংশে আড়াল হয়ে যায়।

এই পাণ্ডুলিপি প্রথমে জেরুজালেমে এবং পরে কনস্টান্টিনোপলে সংরক্ষিত ছিল। ১৯০৬ সালে ডেনিশ পণ্ডিত জোহান লুডভিগ হাইবার্গ পাণ্ডুলিপিটির আলোকচিত্র ধারণ করেন। পরে এটি একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে যায় এবং দীর্ঘ সময় গবেষকদের নাগালের বাইরে ছিল। ২০০০-এর দশকের শুরুতে মাল্টিস্পেকট্রাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাণ্ডুলিপির নীচে লুকিয়ে থাকা বহু লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়। সেই সময় আর্কিমিডিসের গুরুত্বপূর্ণ গণিতবিষয়ক রচনার পাশাপাশি অজানা সাহিত্য ও দর্শনসংক্রান্ত লেখার অংশও আবিষ্কৃত হয়।

তবে একটি বড় সমস্যা রয়ে গিয়েছিল। হাইবার্গের তোলা ছবিতে যে কয়েকটি পৃষ্ঠা দেখা গিয়েছিল, তার মধ্যে তিনটি পৃষ্ঠা পরবর্তীকালে নিখোঁজ হয়ে যায়। গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে এগুলোকে হারিয়ে যাওয়া বলে ধরে নিয়েছিলেন।

সম্প্রতি ফরাসি জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্র (CNRS)-এর গবেষক ভিক্টর গিসেমবার্গ ব্লোয়ার মিউজে দে বো-আর্টস (Musée des Beaux-Arts)-এ সংরক্ষিত একটি পাতাকে বিশ্লেষণ করে দেখেন যে এটি আসলে সেই হারিয়ে যাওয়া পাতাগুলোর একটি। তিনি হাইবার্গের ১৯০৬ সালের আলোকচিত্রের সঙ্গে তুলনা করে নিশ্চিত হন যে এটি প্যালিম্পসেস্টের ১২৩ নম্বর পৃষ্ঠা।

পাতাটির এক পাশে একটি প্রার্থনার লেখা রয়েছে, যা আংশিকভাবে আর্কিমিডিসের জ্যামিতিক চিত্র এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ On the Sphere and the Cylinder–এর প্রথম খণ্ডের ৩৯ থেকে ৪১ নম্বর উপপাদ্যের উপর লেখা হয়েছে। সৌভাগ্যবশত, নীচের অনেক মূল লেখা এখনও পড়া সম্ভব। কিন্তু পাতাটির অপর পাশে একটি ভিন্ন সমস্যা রয়েছে। সেখানে বিংশ শতাব্দীতে আঁকা নবী ড্যানিয়েল ও দুটি সিংহের একটি রঙিন চিত্র রয়েছে, যা নীচের প্রাচীন লেখাকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে।

গবেষকদের আশা, আধুনিক প্রযুক্তি এই বাধা অতিক্রম করতে পারবে। প্রয়োজনীয় অনুমতি পেলে আগামী এক বছরের মধ্যে নতুন ইমেজিং অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মাল্টিস্পেকট্রাল ইমেজিংয়ের পাশাপাশি সিঙ্ক্রোট্রন এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হবে। এই উন্নত প্রযুক্তিগুলো রঙিন চিত্রের নীচে লুকিয়ে থাকা লেখাকে দৃশ্যমান করতে সাহায্য করতে পারে।

এই আবিষ্কার আর্কিমিডিস প্যালিম্পসেস্ট নিয়ে নতুন করে ব্যাপক গবেষণার আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। দুই দশক আগে ব্যবহৃত প্রযুক্তির তুলনায় বর্তমান প্রযুক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে আগে যেসব অংশ অপাঠ্য ছিল, সেগুলিও ভবিষ্যতে উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। যদি তা সফল হয়, তবে প্রাচীন গণিতের ইতিহাসে নতুন তথ্য যুক্ত হবে এবং আর্কিমিডিসের বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হবে।

 

সূত্র: “A leaf from the Archimedes palimpsest rediscovered in Blois” by Victor Gysembergh, 6 March 2026 Zeitschrift für Papyrologie und Epigraphik.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + 15 =