জলবায়ু যত উষ্ণ হয়, প্রাণীর শরীর তত ছোট হওয়ার কথা। জীববিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ে দীর্ঘদিন এমনটাই শেখানো হয়েছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার একদল বন্য বানর সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এদের শরীর বরং আরও ভারী হয়ে উঠছে। গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে অ্যাজারার আউল মাংকি নামে এক ধরনের নিশাচর বানর। উত্তর আর্জেন্টিনার গ্রান চাকো অঞ্চলের বনভূমিতে বসবাসকারী এই প্রাণীদের উপর গত ২৪ বছর ধরে নজর রাখছেন গবেষকেরা। এই দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ থেকেই উঠে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের গবেষক জোনাথন পার্টাইলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ১৯৯৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংগৃহীত ১৮০টি বন্য বানরের ২৮৭টি ওজন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এই সময়ে বানরগুলোর গড় ওজন প্রায় ৫০ গ্রাম বেড়েছে। শুনতে সামান্য মনে হলেও, গড়ে ১.৩ কেজি ওজনের একটি প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে ঐ এলাকার গড় দৈনিক তাপমাত্রা ২২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বেড়ে ২৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়েছে। বিভিন্ন সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখার পর গবেষকেরা দেখেন, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় একটি বানরের ওজন নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তার শৈশবকালীন তাপমাত্রা। এই ফলাফল সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলছে “বার্গম্যানের সূত্র” নামে পরিচিত একটি সুপরিচিত ধারণাকে। ঊনবিংশ শতকে জার্মান জীববিজ্ঞানী কার্ল বার্গম্যান প্রস্তাব করেছিলেন, উষ্ণ রক্তের প্রাণীরা শীতল অঞ্চলে তুলনামূলক বড় আকারের হয়, আর উষ্ণ অঞ্চলে ছোট থাকে। কারণ ছোট শরীর অতিরিক্ত তাপ সহজে বের করে দিতে পারে। সম্প্রতি উত্তর আমেরিকার অনেক ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেহের আকার ছোট হচ্ছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার এই বানরদের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টো ঘটনা। গবেষকদের মতে, এর ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে শৈশবের বিকাশে। ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে প্রচুর শক্তি খরচ হয়। বিশেষ করে শিশু বানরদের ক্ষেত্রে এই খরচ আরও বেশি। ঠান্ডা রাতে শরীর গরম রাখতেই তাদের অনেক ক্যালোরি ব্যয় হয়ে যায়, ফলে বাড়বৃদ্ধির জন্য কম শক্তি অবশিষ্ট থাকে। অন্যদিকে রাত যদি তুলনামূলক উষ্ণ হয়, তাহলে শরীরকে গরম রাখতে কম শক্তি খরচ হয়। অতিরিক্ত শক্তি তখন দেহের কোষকলা ও ওজন বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা যায়। গবেষকদের ধারণা, শৈশবের এই সুবিধাই পরবর্তী জীবনে অপেক্ষাকৃত ভারী শরীর গঠনে ভূমিকা রাখছে। তাছাড়া ওজন বাড়লেও বানরগুলোর দৈর্ঘ্য বাড়েনি। ২৪ বছরে শরীরের লম্বায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। অর্থাৎ অতিরিক্ত শক্তি হাড় লম্বা করতে নয়, বরং শরীরের ভর বাড়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রেও কিছুটা একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। উন্নত দেশগুলোতে মানুষের গড় উচ্চতা এখন প্রায় স্থিতিশীল, যদিও খাদ্যের প্রাচুর্য ও জীবনযাত্রার উন্নতির কারণে শরীরের ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আসলে এই পরিবর্তন কোনো জিনগত বিবর্তনের ফল নয়। বরং এটি “ফেনোটাইপিক প্লাস্টিসিটি”- অর্থাৎ একই জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে ভিন্ন শারীরিক রূপ নিতে পারে। এখন প্রশ্ন হল, পৃথিবীর অন্য উষ্ণ বনাঞ্চলেও কি আরও অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণী একই পথে বদলে যাচ্ছে?
সূত্র: Earth . com ; June ; 2026
