বজ্রপাত বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেঘ থেকে মাটির দিকে ছুটে আসা উজ্জ্বল বিদ্যুৎরেখা। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এমন এক ধরনের বজ্রঝলক রয়েছে, যা মাটির দিকে নামে না। বরং তা প্রবল বজ্রঝড়ের বহু ওপরে, মহাকাশের সীমানার কাছাকাছি আকাশে মুহূর্তের জন্য জ্বলে ওঠে। এর নাম রেড স্প্রাইট। অদ্ভুত লালচে আলো ও জেলিফিশের মতো আকৃতির জন্য এই বিরল বৈদ্যুতিক ঘটনাটি বায়ুমণ্ডলীয় বিদ্যুতের অন্যতম রহস্যময় প্রকাশ। স্প্রাইট মানে রূপকথার রহস্যপরী। সেই অনুষঙ্গে এটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘রেড স্প্রাইট।’
রেড স্প্রাইট সাধারণত পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০–৯০ কিলোমিটার উচ্চতায় তৈরি হয়, প্রচলিত বজ্রপাতের তুলনায় অনেক ওপরে। কিছু স্প্রাইটের বৈদ্যুতিক কাঠামো উল্লম্বভাবে কয়েকশ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এত বিশাল আকারের হলেও এগুলি খালি চোখে দেখা অত্যন্ত কঠিন। কারণ তাদের আলো ক্ষণ মুহূর্তের জন্য উচ্চ বায়ুমণ্ডলের অত্যন্ত পাতলা অঞ্চলে সৃষ্টি হয়। এর জন্মের সূত্রপাত নীচের কোনো শক্তিশালী বজ্রপাত থেকে। কোনো প্রবল বজ্রপাত যখন হঠাৎ তার বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে, তখন তার প্রভাব ঝড়ের ওপরে থাকা বায়ুমণ্ডলের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রেও পড়ে। এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে উচ্চ বায়ুমণ্ডলে বৈদ্যুতিক ভাঙন শুরু হতে পারে। পাতলা বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন অণু তখন শক্তি গ্রহণ করে উত্তেজিত অবস্থায় পৌঁছায় এবং পরে সেই শক্তি আলো হিসেবে ছেড়ে দেয়। এই আলোই হল রেড স্প্রাইটের স্বতন্ত্র রক্তিম আভা। রেড স্প্রাইটের বিচিত্র জেলিফিশ-সদৃশ আকৃতির পেছনেও রয়েছে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বৈদ্যুতিক প্রবাহের সূক্ষ্ম নেটওয়ার্ক। ওপরের দিকে উজ্জ্বল অঞ্চল তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নীচের দিকে দীর্ঘ, শাখা-প্রশাখাময় বৈদ্যুতিক রেখা নেমে আসে। ফলে কয়েক মিলিসেকেন্ডের জন্য আকাশে ফুটে ওঠে বিশাল এক আলোকময় কাঠামো।
এত বড় একটি ঘটনা এত ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় স্প্রাইট দীর্ঘদিন মানুষের চোখের আড়ালে রয়ে গিয়েছিল। এর স্থায়িত্ব কখনও কখনও মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ড। তাই বহু বছর ধরে এগুলি ছিল মূলত ব্যক্তি প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ। অবশেষে ১৯৮৯ সালে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার রেড স্প্রাইটের আলোকচিত্র ধারণ করতে সক্ষম হন। এরপর উচ্চগতির ক্যামেরা ও মহাকাশভিত্তিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই অদৃশ্য বৈদ্যুতিক জগতের সন্ধান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
রেড স্প্রাইট একা নয়। এটি ক্ষণস্থায়ী আলোকময় বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনার বৃহত্তর পরিবারের সদস্য। এই পরিবারের মধ্যে রয়েছে ব্লু জেট, জায়ান্টিক জেট এবং ELVES—অত্যন্ত দ্রুত সৃষ্টি হওয়া বিশালাকার বলয়সদৃশ আলোকঝলক। বজ্রঝড়ের বৈদ্যুতিক প্রভাব শুধু মেঘের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বহু ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
রেড স্প্রাইট কেবলই এক বিচিত্র আলোকদৃশ্য নয়। এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও মহাকাশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে সক্রিয় এক বিশাল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ক্ষণিকের বাতায়ন।
সূত্র: AstroPhilesz
