ইউরোপ জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এসব বিরল ও বিধ্বংসী ঘটনার আগাম পূর্বাভাস দেওয়া এখনও বড় এক সমস্যা। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের একদল গবেষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রচলিত জলবায়ু মডেলকে একসঙ্গে ব্যবহার করে এমন এক পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যা অনেক কম কম্পিউটার শক্তি ব্যবহার করেই বিরল চরম আবহাওয়ার সম্ভাবনা নির্ভুলভাবে অনুমান করতে পারে। এই ধরণের চরম আবহাওয়ার ঘটনা অনেক সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়। তাই এসব ঘটনার প্রকৃত ঝুঁকি জানা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু প্রচলিত জলবায়ু মডেল ব্যবহার করে শত বা হাজার বছরে একবার ঘটে এমন ঘটনার সম্ভাবনা নির্ণয় করতে হলে হাজার হাজার বছরের জলবায়ুর সিমুলেশন চালাতে হয়। বাস্তবে এত দীর্ঘ সময়ের হিসাব করতে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা লাগে, যা প্রায় অসম্ভব। এআই-ভিত্তিক ডিপ লার্নিং মডেল, প্রচলিত জলবায়ু মডেলের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার গুণ কম কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করে। কিন্তু এই মডেলগুলোরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো সাধারণত প্রশিক্ষণের সময় যত ধরনের চরম আবহাওয়ার তথ্য দেখে, তার বাইরে আরও ভয়াবহ ঘটনা কল্পনা করতে পারে না। ফলে ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা তাপপ্রবাহ তৈরি হলে শুধুমাত্র এআইয়ের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন Rare-Event Sampling (RES) নামে একটি কৌশল। এতে দীর্ঘ সময়ের পুরো জলবায়ু সিমুলেশন চালানোর বদলে শুধু সেই পরিস্থিতিগুলোর পর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যেখানে চরম আবহাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নতুন পদ্ধতিতে প্রথমে একটি এআই অ্যালগরিদম অসংখ্য সম্ভাব্য জলবায়ু পরিস্থিতি দ্রুত বিশ্লেষণ করে। এরপর যেগুলোতে তাপপ্রবাহের মতো বিরল ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে হয়, শুধু সেগুলোকেই বিস্তারিতভাবে প্রচলিত পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক জলবায়ু মডেল দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ফলে অপ্রয়োজনীয় বিপুল সংখ্যক সিমুলেশন চালাতে হয় না। গবেষকেরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মধ্য অক্ষাংশের তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস পরীক্ষা করেন। তুলনার জন্য তারা PlaSim নামে একটি অপেক্ষাকৃত সহজ জলবায়ু মডেল ব্যবহার করেন। দেখা যায়, নতুন এআই ও RES-ভিত্তিক পদ্ধতি প্রচলিত মডেলের মতোই প্রায় একই নির্ভুলতা বজায় রাখতে পেরেছে, অথচ কম্পিউটিং শক্তি লেগেছে প্রায় এক হাজার গুণ কম। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি শুধু তাপপ্রবাহ নয়, ঘূর্ণিঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা কিংবা অন্যান্য বিরল চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসেও ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি আরও উন্নত ও জটিল জলবায়ু মডেলের সঙ্গে এই পদ্ধতি যুক্ত করলে, এতদিন যেসব বিশ্লেষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল, সেগুলোও বাস্তবে সম্ভব হয়ে উঠবে। সুইজারল্যান্ডের ETH জুরিখের জলবায়ু বিজ্ঞানী রবিন নয়েল এই গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করেন। তাঁর মতে, যদিও Rare-Event Sampling পদ্ধতি আগে থেকেই ছিল , কিন্তু কোন পরিস্থিতিকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে, সেটি ঠিক করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। সেখানে এআইকে প্রাথমিক বাছাইয়ের কাজে ব্যবহার করার ধারণাটাই এই গবেষণার সবচেয়ে বড় নতুনত্ব। তাঁর ভাষায়, এআই এবং পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিতে তৈরি জলবায়ু মডেল সেই ঘটনাগুলোর নির্ভুল বিশ্লেষণ সম্পন্ন করে। এই যুগলবন্দিই ভবিষ্যতে চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে।
সূত্র: Physics World ; July ; 2026
