কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী যে প্রবল উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তাকে ঘিরেই গুরুত্বপূর্ণ এক সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদেরা। সারা বিশ্বের ১৫০ জনেরও বেশি গবেষক ও গণিতবিদ “লেইডেন ঘোষণা” -তে স্বাক্ষর করেছেন। তাতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এআই সম্পর্কিত দাবিগুলোকে আরও সমালোচনাত্মক ও সতর্ক দৃষ্টিতে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যে বিপুল আশাবাদ ও প্রচার চলছে, তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়। বরং এআইয়ের প্রকৃত সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতাকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তি উদ্ভাবক কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। ফলে তারা নিজেদের প্রযুক্তির ক্ষমতা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি বড় করে দেখাতে পারে। গণিতবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো এআই যদি নির্দিষ্ট কিছু গণিতের সমস্যা সমাধানে সফল হয়, তার অর্থ এই নয় যে সেটি মানুষের মতো যুক্তি, বিচারবোধ বা গভীর চিন্তাশক্তি অর্জন করেছে। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত এআই সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিপণনমূলক দাবি নয়, বরং স্বাধীন ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করা।
ঘোষণাটিকে সমর্থন করেছেন আন্তর্জাতিক গণিত ইউনিয়নের সহ-সভাপতি উলরিকে টিলমান। তিনি বলেন, এআই অবশ্যই গণিত গবেষণার জন্য নতুন ও আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করছে, কিন্তু এর প্রভাব সম্পর্কে এখনও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি। তাঁর মতে, গণিত ও বিজ্ঞান গবেষণার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত মানবিক বিচারবোধ, স্বচ্ছতা এবং বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের যৌথ মূল্যবোধ।
গণিতবিদদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো, এআই এমন সব গাণিতিক প্রমাণ বা সমাধান তৈরি করতে পারে যা দেখতে ঠিক মনে হলেও বাস্তবে ভুলে ভরা। এই ধরনের ভুল অনেক সময় এতটাই সূক্ষ্ম হয় যে অভিজ্ঞ গবেষকদের পক্ষেও তা দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে গবেষণার মান, নির্ভরযোগ্যতা এবং বৈজ্ঞানিক সত্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ভুল শনাক্ত করা যখন কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে তখনই গবেষকরা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাদের এখন আশঙ্কা, এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে, সহপর্যালোচনা প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে এবং স্বাধীন একাডেমিক গবেষণাকে বাণিজ্যিক এআই কোম্পানির স্বার্থের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
লেইডেন ঘোষণা কেবল গণিত বা গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়েই উদ্বিগ্ন নয়। এতে এআইয়ের সম্ভাব্য সামরিক ব্যবহার, গণ-নজরদারি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং পরিবেশগত ক্ষতির মতো বিষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। স্বাক্ষরকারীরা গবেষক ও গণিতবিদদের আহ্বান জানিয়েছেন, তাঁরা যেন নিজেদের কাজের নৈতিক ও সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকেন। এবং মানুষের বা সমাজের ক্ষতির কারণ হতে পারে এমন প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ান।
লেইডেন ঘোষণা এআইকে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান নয়; এটি এক ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে কথা বলে। গণিতবিদদের মতে, এআই একটি প্রভাবশালী প্রযুক্তি হলেও এর সীমাবদ্ধতা, ঝুঁকি এবং সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা জরুরি। মানবিক বিচারবোধ ও বৈজ্ঞানিক সতর্কতার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে এআইকে ব্যবহার করাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও যুক্তিসঙ্গত পথ।
সুত্র: AFP
