কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন লেখালেখি বা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি, দ্রুতই গবেষণাগারের এক নতুন সহকর্মীতে পরিণত হচ্ছে। নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Claude Science, Google DeepMind-এর Co-Scientist, OpenAI-এর গবেষণাভিত্তিক টুল এবং ওপেন-সোর্স Biomni-এর মতো নতুন প্রজন্মের ‘AI Scientist’ আমূল বদলে দিতে শুরু করেছে গবেষণার গতি ও দক্ষতা। এখন প্রশ্ন হলো—সব গবেষণাগারের জন্য কি একই এআই সরঞ্জাম উপযুক্ত?
এর একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনতত্ত্ববিদ ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইউয়ান অ্যাশলি। ২০১০ সালে তাঁর নেতৃত্বে ৩১ জন গবেষকের একটি দল একজন মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম বিশ্লেষণ করতে প্রায় নয় মাস সময় নিয়েছিল। অথচ সম্প্রতি Anthropic-এর Claude ব্যবহার করে তিনি নিজের জিনোম একই মানে বিশ্লেষণ করান মাত্র ৩০ মিনিটে। এআই সঠিকভাবে আলঝেইমার রোগের ঝুঁকিবাহী একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং ওষুধের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করা একাধিক জিন শনাক্ত করে। অ্যাশলির কাছে এই বিষয়টি সত্যিই অবিশ্বাস্য লেগেছে।
এই ‘AI Scientist’ আসলে বৃহৎ ভাষা মডেল -নির্ভর এমন এক ধরনের এজেন্টিক এআই, যা একটি জটিল গবেষণা সমস্যাকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে সমাধান করতে পারে। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ খোঁজা, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণার চিত্র তৈরি, গবেষণাপত্রের খসড়া লেখা থেকে শুরু করে নতুন গবেষণা-ধারণা তৈরি—সব ক্ষেত্রেই এসব সরঞ্জাম কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এমনকি প্রয়োজনে বিশেষায়িত বায়োইনফরমেটিক্স বা প্রোটিন ডিজাইনের সফটওয়্যারের সঙ্গেও এগুলো সমন্বয় করে কাজ করতে পারে।
প্রতিটি এআই সরঞ্জামের কাজের ধরনও আলাদা। Google DeepMind-এর AI scientist মূলত নতুন বৈজ্ঞানিক ধারণা বা হাইপোথিসিস তৈরিতে দক্ষ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজিস্ট ক্লেয়ার ব্রায়ান্ট এই সরঞ্জাম ব্যবহার করে এমন একটি গবেষণা-ধারণা পেয়েছেন, যাকে পরীক্ষামূলকভাবে যাচাইএর কাজ এখন চলছে তাঁর গবেষণাগারে। তাঁর মতে, এআই না থাকলে একই ধারণায় পৌঁছাতে হয়তো দুই বছর সময় লেগে যেত।
অন্যদিকে, Claude Science এবং ওপেন-সোর্স Biomni গবেষণার বাস্তব কাজে বিশেষভাবে দক্ষ—যেমন জিনোম বিশ্লেষণ, জৈবিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, কোড লেখা এবং বিভিন্ন সফটওয়্যার পরিচালনা। গবেষকরা মনে করেন, আগে যে কাজ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত, এখন তা কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে গবেষকেরা বেশি সময় ব্যয় করতে পারছেন বিশ্লেষণ, নতুন প্রশ্ন তৈরি এবং পরীক্ষার নকশা তৈরির মতো সৃজনশীল কাজে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইকে কখনোই অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়। এআই কখনো কখনো ভুল তথ্যও দিতে পারে বা এমন গবেষণা-ধারণা তৈরি করতে পারে, যা বাস্তবে কার্যকর নয়। তাই প্রথমে ছোট ও সহজে যাচাইযোগ্য কাজ দিয়ে এআই ব্যবহার শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে তাদের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা বোঝার পরই তাকে গবেষণায় নিয়মিতভাবে যুক্ত করা উচিত।
মোদ্দাকথা, ‘AI Scientist’ গবেষকের বিকল্প নয়; বরং এটি এক শক্তিশালী ডিজিটাল গবেষণা-সহকারী। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি গবেষণার সময় কমাতে, নতুন বৈজ্ঞানিক ধারণার জন্ম দিতে এবং আবিষ্কারের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশা রাখেন, ভবিষ্যতের গবেষণাগারে মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যৌথ অংশীদারিত্বই সম্ভবত হবে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের নতুন ভিত্তি।
সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-02091-6
