একাকিত্বের সমাধান: মজবুত সমাজ

একাকিত্বের সমাধান: মজবুত সমাজ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ আগষ্ট, ২০২৬

একাকিত্বকে এখন ক্রমেই জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সংকটগুলির একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে একা থাকা বা অর্থবহ সামাজিক সম্পর্কের অভাব শুধু মানসিক সুস্থতাই নয়, শারীরিক স্বাস্থ্যেরও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তবে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান–এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা সতর্ক করে বলছে, একাকিত্বকে কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত সামাজিক কারণগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে। গবেষকদের মতে, চিকিৎসাব্যবস্থা একাকিত্ব শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু ভেঙে যাওয়া সামাজিক সম্পর্ক, দুর্বল সম্প্রদায় বা বিচ্ছিন্ন জীবনযাত্রাকে পুনর্গঠন করতে পারে না।

সোশ্যাল প্রবলেম পত্রিকায় গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গত এক দশকে একাধিক গবেষণা একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে হৃদ্‌রোগ, মানসিক অবনতি, অকালমৃত্যু এবং স্বাস্থ্যব্যয় বৃদ্ধির সম্পর্ক তুলে ধরার পর বিষয়টি বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের আলোচনায় উঠে এসেছে। এমনকি একটি বহুল আলোচিত গবেষণায় বলা হয়, পর্যাপ্ত সামাজিক সম্পর্ক না থাকার ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমতুল্য হতে পারে। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা একা বসবাস— প্রতিটি ক্ষেত্রেই অকালমৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। শুধু স্বাস্থ্য নয়, এর অর্থনৈতিক প্রভাবও বেশ বড়। যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্কদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে মেডিকেয়ারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

গবেষণা পত্রের প্রধান লেখক সোফিয়া হিল্টনারের মতে, স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে একাকিত্বের সম্পর্ক প্রকাশ পাওয়ার পর সমাজ এটিকে জরুরি সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করে। কিন্তু এর ফলে একটি ভুল ধারণাও তৈরি হয়েছে। যেহেতু এটি স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই ধরে নেওয়া হয়, সমাধানের দায়ও যেন শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার। বাস্তবে রোগীর একাকিত্ব শনাক্ত করতে বা বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন চিকিৎসক , কিন্তু দীর্ঘ কর্মকাল কমানো, নিরাপদ ও সক্রিয় জনসমাজ গড়ে তোলা, কিংবা মানুষের সামাজিক মেলামেশার সুযোগ বাড়ানোর মতো কাঠামোগত পরিবর্তন তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

হিল্টনার এই গবেষণার অনুপ্রেরণা পান নিজের দিদার জীবন থেকে। দাদু মারা যাওয়ার পর তার দিদা ধীরে ধীরে একাকী হয়ে পড়েন। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে ভাবতে শেখায়- একজন মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক, সামাজিক ও নীতিগত কারণও কাজ করে। পরবর্তীতে গবেষণার সময় তিনি এমনকি

একাকিত্ব কমানোর বড়ি নিয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণার কথাও জানতে পারেন। তখন থেকেই তার মনে প্রশ্ন জাগে: সামাজিক সমস্যার সমাধান কি সত্যিই ওষুধে সম্ভব?

আরও দেখা যায়, একাকিত্বকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আওতায় আনার উদ্যোগ প্রথমে চিকিৎসকদের কাছ থেকে আসেনি; বরং গবেষক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বীমা সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় এটি স্বাস্থ্যখাতের আলোচনায় স্থান পায়। গবেষকদের মতে, একাকিত্বকে স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করাটা যেমন সচেতনতা, অর্থায়ন ও নীতিগত পদক্ষেপ বাড়াতে সাহায্য করে, তেমনি এটি সামাজিক সম্পর্ক, কর্মপরিবেশ ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সমাধানের গুরুত্ব কমিয়েও দিতে পারে। তাই একাকিত্ব মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি এমন সামাজিক নীতি প্রয়োজন, যা বিচ্ছিন্নতার কারণগুলোকে আগেভাগেই কমিয়ে এনে মানুষের মধ্যে স্থায়ী সংযোগ ও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করবে।

সূত্র:“The medicalization of loneliness: Addressing social ills through healthcare” by Sofia Hiltner, 8 June 2026, Social Problems. DOI: 10.1093/socpro/spag034

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − five =