এজিআই: স্বপ্ন, মায়া, নাকি বাস্তব ?  

এজিআই: স্বপ্ন, মায়া, নাকি বাস্তব ?  

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে “এজিআই’’ বা আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বহুদিন ধরেই এক স্বপ্ন। এ এমন এক এআই, যা মানুষের মতোই বুদ্ধিমান। কিন্তু সমস্যাটা হলো, “মানুষের মতো বুদ্ধি’’ বলতে ঠিক কি বোঝায়, তা নিয়েই বিজ্ঞানীদের মধ্যে তর্কের শেষ নেই। তাই এজিআই-এর কোনো একক, সর্বসম্মত সংজ্ঞা আজও তৈরি হয়নি। এই অস্পষ্টতার মধ্যেই প্রযুক্তি বিশ্লেষক লেক্স ফ্রিডম্যান একটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন তোলেন, যা বেশ অদ্ভুত এবং ভাবনার খোরাক জোগায়। তাঁর মতে, যদি কোনো এআই নিজে থেকেই একটি প্রযুক্তি কোম্পানি শুরু করে এবং সেটিকে এক বিলিয়ন ডলারের মূল্যে পৌঁছে দিতে পারে, তাহলে কি সেটিকে এজিআই বলা যাবে? এই প্রশ্ন তিনি রাখেন এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং-এর সামনে। তিনি আরও জানতে চান, আগামী ৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে এমন এআই তৈরি করা সম্ভব কি না! হুয়াং-এর উত্তর ছিল চমকপ্রদ। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, আমরা ইতিমধ্যেই এজিআই অর্জন করেছি।” তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবতার দিকটিও তুলে ধরেন। অর্থাৎ এজিআই-কে সংজ্ঞায়িত করা না গেলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে দ্রুত মানুষের ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

এজিআই কি? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর আজও মেলেনি। সাধারণভাবে এজিআই মানে মানুষের মতন বুদ্ধিমত্তা। তবে একটি সফল ব্যবসা তৈরি করা বুদ্ধিমত্তার একটি দিক হতে পারে, কিন্তু মানুষের বহুমাত্রিক বুদ্ধিমত্তার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। অর্থাৎ এজিআই এমন একটি বুদ্ধিমত্তা, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করতে পারে। যেমন যুক্তি প্রয়োগ, শেখা, স্মৃতি ব্যবহার করা, সামাজিক পরিস্থিতি বোঝা এবং নতুন সমস্যার মুখোমুখি হলে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু এই সংজ্ঞা নিয়েও ঐকমত্য নেই। কেউ মনে করেন, এজিআই-কে মানুষের সব ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার সমান হতে হবে। আবার কেউ বলেন, এমন নিখুঁত সংজ্ঞা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে “এজিআই’’ শব্দটি আজও অনেকটাই ধোঁয়াশায় ঢাকা। এই অস্পষ্টতাকে ঘিরে সমালোচনাও রয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, এই শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখা হয়, যাতে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি সহজে বড় বড় দাবি করতে পারে এবং নিজেদের অগ্রগতি বাড়িয়ে দেখাতে পারে।

ফলে “এজিআই’’ শব্দটি আজও ধোঁয়াশায় ঘেরা। তবুও এই অস্পষ্ট লক্ষ্যকেই সামনে রেখে ছুটছে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। যাদের সম্মিলিত বাজারমূল্য ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তারা দাবি করছে, এজিআই-ই তাদের চূড়ান্ত গন্তব্য। কিন্তু অনেক কম্পিউটার বিজ্ঞানী এই শব্দটি ব্যবহারই করতে চান না। তাদের মতে, যে জিনিসের স্পষ্ট সংজ্ঞা বা পরিমাপই নেই, সেটিকে লক্ষ্য বানানো অর্থহীন। আবার অন্য একদল গবেষকের অভিযোগ আরও তীব্র। তাদের মতে, “এজিআই’’ শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখা হয়। কারণ এতে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির পক্ষে বড় বড় দাবি করা সহজ হয়ে যায়। তারা কতটা এগিয়েছে, তার নির্দিষ্ট মাপকাঠি না থাকায় ‘অগ্রগতি’দেখানোটাও সহজ।

লেক্স ফ্রিডম্যানের পডকাস্ট প্রকাশের ঠিক কয়েক দিন আগেই এজিআই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে গুগল ডিপমাইন্ড-এর এক গবেষণা। এই দলে ছিলেন সহ-প্রতিষ্ঠাতা শেন লেগ, যিনি ২০০০-এর দশকের শুরুতে “এজিআই’’ শব্দটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তাদের নতুন গবেষণাপত্র, ‘মেজারিং প্রগ্রেস টুওয়ার্ড এজিআই: আ কগনিটিভ ফ্রেমওয়ার্ক’ এজিআই-কে আরও বৈজ্ঞানিকভাবে সংজ্ঞায়িত ও মূল্যায়ন করার একটি কাঠামো দিতে চায়। এই গবেষণার ভিত্তি মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও জ্ঞানবিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের গবেষণা। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি “কগনিটিভ ট্যাক্সোনমি” বা বোধবুদ্ধিগত শ্রেণিবিন্যাস। এখানে ১০টি মৌলিক মানসিক ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। যেমন অনুভূতি, যুক্তি, স্মৃতি, শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ এবং সামাজিক বোঝাপড়া। গবেষকদের মতে, এই ক্ষমতাগুলির সমন্বয়েই গড়ে ওঠে প্রকৃত “সাধারণ বুদ্ধিমত্তা’’। এই কাঠামো অনুযায়ী, কোনো এআই-কে, ‘এজিআই’ বলতে হলে তাকে এই ১০টি ক্ষেত্রেই মূল্যায়ন করতে হবে এবং তার কাজকর্মের তুলনা করতে হবে অন্তত মাধ্যমিক-স্তরের শিক্ষিত একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। অর্থাৎ, এক-দুটি ক্ষেত্রে ভালো হলেই চলবে না – সব ক্ষেত্রেই গড় মানুষের সমতুল্য হতে হবে।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, বর্তমান এআই মডেলগুলির বুদ্ধিমত্তা “সমানভাবে বিস্তৃত’’ নয়। তার বিস্তার অসম। যেমন, গণিত বা তথ্য মনে রাখার ক্ষেত্রে এআই-এর কিছু মডেল অনেক মানুষের চেয়েও এগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি ধরে রাখা বা সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে এগুলি এখনও অনেক পিছিয়ে। সুতরাং, গুগল ডিপমাইন্ড-এর গবেষকদের মতে, কোনো এআই-কে এখনও সত্যিকারের এজিআই বলা যায় না। আর যদি বলতে হয়, তাহলে তাকে এই সবগুলো ক্ষেত্রেই অন্তত গড় মানুষের মতো দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তার আগে পর্যন্ত, এআই যতই উন্নত হোক না কেন, তার বুদ্ধিমত্তা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

এজিআই-কে সঠিকভাবে মাপার জন্য গবেষকেরা বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন। গুগল ডিপমাইন্ড এই লক্ষ্যেই ক্যাগল প্ল্যাটফর্মে একটি প্রতিযোগিতা শুরু করেছে, যেখানে উন্নত মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরির চেষ্টা চলছে। একইভাবে ড্যান হেনড্রিক্স এবং ইয়োশুয়া বেংজিও-এর গবেষণায় “এজিআই স্কোর’’ নির্ধারণের একটি পদ্ধতি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন মানসিক ক্ষমতার ভিত্তিতে এআই-এর কর্মকৃতি মাপা হয়। ফলাফল খুব আশাব্যঞ্জক নয়। সবচেয়ে উন্নত মডেল হিসেবে ধরা হয় ওপেন এআই-এর GPT-5-কে। এটি ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেটিও মাত্র ৫৭% স্কোর করতে পেরেছে। অর্থাৎ, সব মানসিক ক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত মানুষের সমতুল্য হতে তার এখনও অনেকটাই দেরি। আর সেই অসম্পূর্ণতাকে সঠিকভাবে মাপার চেষ্টাই এখন গবেষণার নতুন কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমান এআই ঠিক কোথায় পিছিয়ে? সেটা স্পষ্ট করে দেখানোর অন্যতম সাহসী উদ্যোগ হলো ARC-AGI বেঞ্চমার্ক। এটি তৈরি করেছেন প্রখ্যাত মেশিন লার্নিং গবেষক ফ্রাঁসোয়া চোলে। চোলের মূল বক্তব্য বেশ ভিন্নধর্মী। তাঁর মতে, বুদ্ধিমত্তা মাপা উচিত কোনো সিস্টেম আগে থেকে কত কিছু জানে তা দিয়ে নয়, বরং নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে সে কতটা দক্ষ, তা দিয়ে। অর্থাৎ বুঝতে হবে, ‘জানা’ আর ‘শেখার ক্ষমতা’ এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কতটা গভীর। ARC-AGI বেঞ্চমার্ক আসলে দেখতে খুব সাধারণ। রঙিন ঘরওয়ালা কিছু গ্রিড পাজল। কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে কঠিন পরীক্ষা। প্রতিটি সমস্যায় কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া থাকে, যেখানে একটি ইনপুট গ্রিড কীভাবে একটি আউটপুটে বদলাচ্ছে তা দেখানো হয়। সেই লুকোনো নিয়মটি বুঝে নতুন ইনপুটে প্রয়োগ করাই পরীক্ষার্থীর কাজ। মানুষের জন্য এই প্যাটার্ন ধরতে সাধারণত কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষের জন্য এটি সহজ হলেও এআই-এর জন্য কঠিন। কারণ এখানে দরকার নমনীয় চিন্তা, বিমূর্ত ধারণা বোঝা এবং কম তথ্য থেকে শেখার ক্ষমতা। এই দক্ষতাগুলিই এখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুর্বল দিক।

ARC-AGI-3—এই বেঞ্চমার্কের সবচেয়ে উন্নত সংস্করণ। আগের সংস্করণগুলিতে স্থির পাজল ছিল। আর নতুন সংস্করণটি ইন্টারঅ্যাকটিভ বা আন্তঃক্রিয়ামূলক। এখানে এআইকে শুধু সমস্যা সমাধান করলেই হবে না। তাকে নতুন পরিবেশ অন্বেষণ করতে হবে, চলতে চলতে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, নিজের মতো করে “বিশ্বের মডেল” তৈরি করতে হবে এবং ধাপে ধাপে শিখতে হবে। মানুষের কাছে এগুলি স্বাভাবিক হলেও, এআই-এর কাছে এগুলো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

“বুদ্ধিমত্তা’’ ঠিক কি ? এই প্রশ্ন, চিন্তাভাবনার বিজ্ঞানের মতনই পুরোনো। ১৯৫০ সালে, যখন “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” শব্দটিই তৈরি হয়নি, তখনই বিখ্যাত ব্রিটিশ গণিতবিদ ও কম্পিউটার পথিকৃৎ অ্যালান ট্যুরিং এক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হন। “বুদ্ধিমত্তা’’ আসলে কি, তা সংজ্ঞায়িত করা এতটাই জটিল যে এর সহজ কোনো উত্তর নেই। এই সমস্যার সরাসরি সংজ্ঞা দেওয়ার বদলে ট্যুরিং এক অভিনব পদ্ধতি প্রস্তাব করেন। “ইমিটেশন গেম’’, যা পরে ‘ট্যুরিং টেস্ট’ নামে পরিচিত হয়। এই পরীক্ষার মূল ধারণা ছিল সহজ। যদি কোনো মেশিন টেক্সটের মাধ্যমে এমনভাবে মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করতে পারে, যাতে একজন তৃতীয় ব্যক্তি বুঝতে না পারেন কে মানুষ, আর কে মেশিন তাহলেই সেই মেশিনকে বুদ্ধিমান বলা যাবে। কিন্তু এই পরীক্ষাও দ্রুত বিতর্কের জন্ম দেয়। ১৯৬০-এর দশকে MIT-এ তৈরি হয় একটি চ্যাটবট ‘এলিজা’। এটি মনোচিকিৎসকের মতো কথা বলার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। বাস্তবে, ভাষা বোঝার ক্ষমতা খুব সীমিত হলেও এলিজা অনেককে বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল। সুতরাং ট্যুরিং টেস্ট পাশ করা মানেই মানুষের মতো পূর্ণ বুদ্ধিমত্তা নয়। একই ঘটনা দেখা যায় আরও উন্নত চ্যাটবট ইউজিন গুস্‌টম্যান-এর ক্ষেত্রে। ২০১৪ সালে একটি ট্যুরিং টেস্ট প্রতিযোগিতায় আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটিও মানুষের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। আজকের বড় ভাষা মডেলগুলো এলিজা-র তুলনায় অনেক বেশি সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে। কিন্তু তাতেই কি তারা মানুষের মতো বুদ্ধিমান? উত্তরটা এখনও “না’’। কারণ, এই এআই-গুলি এখনও নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে। কখনও সেগুলি ভুল তথ্য বানিয়ে ফেলে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় হোঁচট খায়, আবার কখনও মানুষের মতো অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ক্ষমতাতেও সেগুলির ঘাটতি চোখে পড়ে।

এখানেই আসে এজিআই-এর একটি তুলনামূলক নতুন ধারণা। শব্দটি ১৯৯৭ সালে, মার্ক গাবরুড প্রথম ব্যবহার করেন। মার্ক, মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তিনি এমন এআই-এর কথা বলেছিলেন, যা মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল, দ্রুত, এবং যেকোনো ধরনের জ্ঞান অর্জন ও ব্যবহার করতে সক্ষম। অর্থাৎ যে বুদ্ধিমত্তা, প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষের বিকল্প হতে পারে। তবে তাঁর এই ধারণা তখন তেমন সাড়া ফেলেনি, প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। কয়েক বছর পর, ২০০০-এর দশকের শুরুতে, একই শব্দটি নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসেন শেন লেগ। বেন গোয়ের্টজেল এবং কাসিও পেন্নাচিন-এর সঙ্গে শেন কাজ করছিলেন এমন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, যা শুধু একটি নির্দিষ্ট কাজ নয়, বরং নানা ধরনের সমস্যা সমাধান করতে পারে। সেই সময়কার প্রচলিত এআই ছিল “নির্দিষ্ট কাজের বিশেষজ্ঞ’’। একটি কাজ শিখে নিয়ে সেটাতেই সেটি সীমাবদ্ধ থাকত। এই সীমাবদ্ধতার বাইরে মেশিনের বুদ্ধিমত্তাকে চিহ্নিত করতেই দরকার হয় নতুন একটি নাম। “রিয়েল এআই’’ বা “স্ট্রং এআই’’-এর মতো নাম ভাবা হলেও, শেষ পর্যন্ত শেন প্রস্তাব দেন এজিআই-এর। এজিআই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং আজ তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতে সবচেয়ে আলোচিত।

এজিআই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন বেন গোয়ের্টজেল তাঁর বইয়ে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, এজিআই এমন একটি এআই ব্যবস্থা, যার নিজের সম্পর্কে কিছুটা বোঝাপড়া আছে, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, নানা প্রেক্ষিতে জটিল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম, এবং নতুন সমস্যার মুখোমুখি হলে সেগুলিও শিখে নিতে পারে। এই সংজ্ঞা একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করেছিল সাধারণ এআই আর নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি “নির্দিষ্ট’’মেশিন লার্নিং সিস্টেমের মধ্যে। কিন্তু সমস্যাটা থেকেই গেল অন্য জায়গায়। “কিছুটা ধারণা’’ বলতে ঠিক কতটা? “জটিল সমস্যা” বলতে কি ধরনের সমস্যা? কোন প্রেক্ষিতকে ধরা হবে? এইসকল প্রশ্নর কোনো স্পষ্ট উত্তর ছিল না। পরবর্তীতে শেন আরও সহজভাবে এজিআই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই অস্পষ্টতাকে কিছুটা বাড়িয়েই দেন। তাঁর কথায়, এজিআই হলো এমন একটি কৃত্রিম সত্তা, যা মানুষের মতো নানা ধরনের জ্ঞানগত কাজ করতে পারে। এটাই ন্যূনতম মানদণ্ড।

 

শুনতে সহজ, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, “মানুষের মতো’’ বলতে ঠিক কি বোঝানো হচ্ছে? কোন কাজগুলো? আর কোন মানুষকে মানদণ্ড ধরা হবে? ফলে স্পষ্ট হয়, এজিআই নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রেই ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু মৌলিক প্রশ্ন। এই বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যায় আরেকটি কারণে। জনসাধারণের আলোচনায় প্রায়ই এজিআইকে গুলিয়ে ফেলা হয় “এএসআই’’ বা Artificial Superintelligence-এর সঙ্গে। যা এমন এক এআই যা সমস্ত মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তার থেকেও বেশি শক্তিশালী হবে। তবে এআই গবেষকদের কাছে এই দুটি আলাদা ধাপ। এজিআই মানে মানুষের সমতুল্য বুদ্ধিমত্তা অর্জন, আর এএসআই তার অনেক ওপরে—এক সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তর। কিন্তু সাধারণ মানুষের কল্পনায় এই দুই ধারণা প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে। আর কর্পোরেট দুনিয়া এই ধারণাকে একেবারে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেছে, কখনও কখনও বেশ অদ্ভুতভাবেই। প্রথম বড় উদাহরণ ডিপ মাইন্ড। ২০১০ সালে শেন লেগ, ডেমিস হাসাবিস ও মুস্তাফা সুলেইমান, যে সংস্থাটি গড়ে তোলেন তার লক্ষ্য ছিল কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (এজিআই)। অর্থাৎ এটি শুধু গবেষণার সংস্থা নয়, এর সরাসরি ব্যবসায়িক লক্ষ্যও ছিল। পাঁচ বছর পর ওপেন এআই-ও একই পথে হাঁটল। ২০১৫-তে তারা মানবকল্যাণমুখী এজিআই তৈরির কথা বলে। কিন্তু ২০১৮-তে মুনাফাজনক শাখা গড়ার পর তারা সেই সংজ্ঞা বদলে দেয়। তখন এজিআই মানে দাঁড়ায় এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশিরভাগ কাজে মানুষের চেয়ে এগিয়ে। ফলে “বুদ্ধিমত্তা’’র সঙ্গে “আর্থিক সাফল্য’’ও যুক্ত হয়। ২০১৯ সালে মাইক্রোসফট যখন ওপেন এআই-তে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে, তখন চুক্তিতে বলা হয়, এজিআই ছাড়া সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার বাণিজ্যিক অংশীদার মাইক্রোসফট। পরে ২০২৩-এর নতুন বিনিয়োগ চুক্তিতে, ২০২৪-এর প্রতিবেদনে জানা যায়, এজিআই বলতে এমন প্রযুক্তি বোঝানো হয়েছে, যা কমপক্ষে ১০০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা আনতে পারে। বাস্তবে ওপেন এআই এখনও অনেক দূরে। আয় প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার হলেও বিপুল খরচের কারণে লাভ আসতে সময় লাগবে। তবুও সিইও স্যাম অল্টম্যান কখনও বলেন, এজিআই তৈরির পথ পরিষ্কার, আবার কখনও স্বীকার করেন, শব্দটি অস্পষ্ট। একইভাবে মাইক্রোসফট-ও জিপিটি-৪-কে “প্রাথমিক এজিআই’’বলে প্রচার করেছে। এদিকে গুগল ডিপমাইন্ড এবং ড্যান হেনড্রিক্স–ইয়োশুয়া বেংজিও -এর গবেষণা দেখাচ্ছে, বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনও মানুষের পূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার সমকক্ষ নয়। তাই শেষ প্রশ্ন, এজিআই কি সত্যিই লক্ষ্যর কাছাকাছি, নাকি তা শুধু একটি বড় প্রতিশ্রুতি? হয়তো নতুন মাপকাঠি দরকার? কৃত্রিম জেনারেল বুদ্ধিমত্তা (এজিআই)-র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানুষের মতো নয়, বরং একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তার মতো চিনতে ও নেতৃত্ব দিতে পারবে। ততদিন পর্যন্ত, এজিআই রয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝামাঝি এক ধোঁয়াশা-তেই।

 

সূত্র: Fortune; March; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + one =