এভারেস্ট, না চিম্বোরাজো? 

এভারেস্ট, না চিম্বোরাজো? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ জুন, ২০২৬

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের নাম এভারেস্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৮৪৮.৮৬ মিটার উচ্চ এই হিমালয়শৃঙ্গ। কিন্তু মজার বিষয় হলো, পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে দূরের বিন্দু এভারেস্ট নয়। সেই বিরল সম্মানটি দখল করে আছে ইকুয়েডরের আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত সুপ্ত আগ্নেয়গিরি চিম্বোরাজো।

প্রথম শুনলে বিষয়টি যেন যুক্তির বিপরীত মনে হতে পারে। কারণ চিম্বোরাজোর উচ্চতা মাত্র ৬,২৬৮ মিটার—এভারেস্টের তুলনায় প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার কম। তবুও পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে পরিমাপ করলে চিম্বোরাজোর শীর্ষবিন্দু এভারেস্টের চেয়ে প্রায় ২.১ কিলোমিটার বেশি দূরে অবস্থান করছে। এই বৈপরীত্যের উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতিতে।

আমরা সাধারণত পৃথিবীকে একটি নিখুঁত গোলক হিসেবে কল্পনা করি। বাস্তবে তা নয়। নিজের অক্ষের চারদিকে ঘূর্ণনরত পৃথিবী নিরক্ষরেখা অঞ্চলে সামান্য স্ফীত এবং মেরু অঞ্চলে কিছুটা চাপা। বিজ্ঞানীরা একে বলেন অবলেট স্ফেরয়েড। আবার কেউ কেউ বলেছেন পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মতোই বা যাকে বলে জিয়ড। ফলে নিরক্ষরেখার কাছাকাছি অবস্থিত যেকোনো স্থান পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে স্বাভাবিকভাবেই বেশি দূরে থাকে।

চিম্বোরাজো নিরক্ষরেখার খুব কাছাকাছি, মাত্র দেড় ডিগ্রি দক্ষিণে অবস্থিত। অন্যদিকে এভারেস্ট রয়েছে প্রায় ২৮ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে। এই অবস্থানগত পার্থক্যের কারণেই চিম্বোরাজোর পাদদেশ থেকেই পৃথিবীর কেন্দ্রের দূরত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। এর সঙ্গে পর্বতের উচ্চতা যোগ হয়ে শীর্ষবিন্দুটিকে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬,৩৮৪.৪ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গেছে। তুলনায় এভারেস্টের শীর্ষের দূরত্ব প্রায় ৬,৩৮২.৩ কিলোমিটার।

তবে এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। অনেক সময় বলা হয়, চিম্বোরাজো হলো পৃথিবীর সেই স্থান যা “মহাকাশের সবচেয়ে কাছে”। কথাটি আংশিক সত্য। যদি দূরত্বের মানদণ্ড হয় পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে মাপা ব্যাসার্ধ, তাহলে চিম্বোরাজোই বিজয়ী। কিন্তু যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতাকে ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে এভারেস্টই মহাকাশের কাছাকাছি, কারণ তার শীর্ষ চিম্বোরাজোর তুলনায় অনেক বেশি উঁচু।

চিম্বোরাজোর এই বিশেষ মর্যাদার পেছনে পৃথিবীর নিরক্ষীয় স্ফীততার ভূমিকা এতটাই বড় যে পর্বতের নিজস্ব উচ্চতা সেখানে গৌণ হয়ে যায়। নিরক্ষরেখার সমুদ্রপৃষ্ঠই মেরু অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় ২১ কিলোমিটার বেশি দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ চিম্বোরাজোর অধিকাংশ সুবিধা এসেছে তার ভৌগোলিক অবস্থান থেকে, উচ্চতা থেকে নয়।

এই তথ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিজ্ঞানের ইতিহাসও। অষ্টাদশ শতকে ফরাসি জিওডেসিক অভিযানের বিজ্ঞানীরা ইকুয়েডরে এসে পৃথিবীর আকৃতি নির্ধারণের জন্য দীর্ঘ গবেষণা পরিচালনা করেন। তাদের পরিমাপই নিশ্চিত করে যে পৃথিবী নিখুঁত গোলক নয়, বরং নিরক্ষরেখায় স্ফীত। সেই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই আজ ব্যাখ্যা করে কেন তুলনামূলকভাবে খাটো একটি আগ্নেয়গিরি পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে দূরের স্থলবিন্দুর খেতাব ধরে রেখেছে।

 

চিম্বোরাজো ও এভারেস্টের এই তুলনা থেকে একটি মৌলিক শিক্ষা পাওয়া গেল। বিজ্ঞানে সঠিক প্রশ্ন করাটাই অনেক সময় সঠিক উত্তর পাওয়ার চাবিকাঠি। “সর্বোচ্চ” আর “সবচেয়ে দূরে”—দুটি শব্দ শুনতে কাছাকাছি হলেও তাদের অর্থ এক নয়। কোন পরিমাপ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে কোন শৃঙ্গটি সত্যিই সবার উপরে।

সূত্র: space Daily, 30th May 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 + eighteen =