এলোমেলো তথ্যকে কীভাবে সামাল দেয় মস্তিষ্ক 

এলোমেলো তথ্যকে কীভাবে সামাল দেয় মস্তিষ্ক 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ অক্টোবর, ২০২৬

অন্ধকারে হঠাৎ কোনও ছায়াকে মানুষের মুখ বলে মনে হতে পারে, কিংবা মুহূর্তের জন্য কমলালেবুকে আপেলের মতো দেখাতে পারে। চোখের দেওয়া তথ্য সবসময় স্পষ্ট বা নির্ভুল হয় না। তবু আমাদের মস্তিষ্ক সাধারণত চারপাশের জগতের একটি সুসংগত ছবি তৈরি করে নেয়। সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় ইঁদুরের মস্তিষ্ক নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা এর একটি সম্ভাব্য স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের মধ্যে পাশাপাশি থাকা বিভিন্ন দৃষ্টি-অঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে ঐকমত্য তৈরি করতে পারে।

গবেষণাটি করেছেন কোল্ড স্প্রিং হারবার ল্যাবরেটরির সিনথিয়া আর. স্টেবিনস ফেলো মিত্রা জাভাদজাদে এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সহযোগীরা। গবেষণাটি নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে নেচার নিউরসায়েন্স জার্নালে। এখানে তাঁরা মস্তিষ্কের দুটি দৃষ্টি-অঞ্চল-এর পারস্পরিক যোগাযোগ বিশ্লেষণ করেছেন, i) প্রাথমিক ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স V1 এবং ii) ল্যাটেরোমেডিয়াল ভিস্যুয়াল এরিয়া / পার্শ্ব-মধ্যবর্তী দৃশ্যমান অঞ্চল (LM।)। দুটি অঞ্চলই ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সের অংশ এবং একে অপরের সঙ্গে দুই তরফা সংকেত আদান-প্রদান করে।

গবেষণার জন্য ইঁদুরকে দুটি বিপরীত কোণে হেলে থাকা রেখা বা নকশা আলাদা করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট একটি নকশা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারলে ইঁদুরকে পুরস্কৃত হবে। পরীক্ষার সময় গবেষকেরা অল্প সময়ের জন্য কখনও V1, কখনও LM অঞ্চলের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেন এবং অন্য অঞ্চলটি একা কীভাবে কাজ করছে তা রেকর্ড করেন।

এই তথ্য ব্যবহার করে গবেষকেরা V1 ও LM-এর স্নায়বিক সংযোগের একটি কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক মডেল তৈরি করেন। সাতটি ইঁদুরের মোট ১৯৪টি V1 নিউরন এবং ২২৮টি LM নিউরন-এর কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে মডেলটি তৈরি করা হয়। এতে দেখা যায়, দুই অঞ্চলের স্নায়বিক কার্যকলাপের ধরন যখন পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তখন সেই কার্যকলাপ তুলনামূলকভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিপরীতে, দুই অঞ্চলের কার্যকলাপে অমিল দেখা দিলে সেই অসামঞ্জস্য এক সেকেন্ডের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশের মধ্যেই দ্রুত কমে যায়।

গবেষকদের মতে, এই পারস্পরিক সংযোগকে একধরণের ঐকমত্য গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের বিভিন্ন বিশেষায়িত অঞ্চল আলাদা ধরনের সংবেদনশীল তথ্য গ্রহণ করলেও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে তারা একটি অভিন্ন ব্যাখ্যার দিকে এগোয়। সেটিই শেষ পর্যন্ত জগতের একটি সুসংগত চিত্র তৈরি করে।

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু দৃষ্টিশক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন, মস্তিষ্কের বৃহত্তর নিও কর্টেক্সের অন্যান্য অঞ্চলও একই প্রক্রিয়ায় কাজ করে কি না। এমনকি চোখে দেখা ও কানে শোনা তথ্য পরস্পর বিরোধী হলে মস্তিষ্ক একই ধরনের প্রক্রিয়ায় সেই দ্বন্দ্ব মেটায় কি না, সেটিও ভবিষ্যৎ গবেষণার বিষয় হবে। মস্তিষ্ক কীভাবে বিচ্ছিন্ন তথ্যকে একত্র করে একটি সামগ্রিক উপলব্ধি তৈরি করে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এই ধারণা থেকে। পাশাপাশি পরস্পরবিরোধী তথ্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার নকশাতেও নতুন ধারণা উঠে আসতে পারে।

 

সূত্র: “Reciprocal connections dynamically build consensus between neocortical areas” by Mitra Javadzadeh, Marine Schimel, Sonja B. Hofer, Yashar Ahmadian and Guillaume Hennequin, 18 September 2026, Nature Neuroscience.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 1 =