এ আই: বিকল্প নয়, সহযোগী

এ আই: বিকল্প নয়, সহযোগী

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ জুন, ২০২৬

সম্প্রতি নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে কোকরেন সংস্থার প্রধান সম্পাদক রূপা সরকার ব্যাখ্যা করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈজ্ঞানিক রচনা পর্যালোচনার কাজে সহায়ক হলেও বর্তমানে এটি মানুষের বিকল্প হতে পারে না। বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে এআই-এর সীমাবদ্ধতা এখনো গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ ও সংকলনের জন্য যে সিস্টেম্যাটিক রিভিউ তৈরি করা হয়, তা চিকিৎসা পদ্ধতি, জনস্বাস্থ্য নীতি এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধরনের পর্যালোচনায় কোনো ভুল তথ্য বা পক্ষপাতদুষ্ট বিশ্লেষণ হলে রোগীদেরা্ আশা বৃথা হবে।আবার স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অকার্যকর বা অনিরাপদ চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।

বর্তমানে অনেক এআই-ভিত্তিক সরঞ্জাম দাবি করছে যে তারা দ্রুতগতিতে বৈজ্ঞানিক রচনা পর্যালোচনা করতে সক্ষম।এসব সরঞ্জাম সাধারণত মানুষের অনুসৃত ধাপগুলো অনুকরণ করে।যেমন প্রাসঙ্গিক গবেষণা খুঁজে বের করা, তথ্য সংগ্রহ করা, বিশ্লেষণ করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করা।আবার অনেক সময় এসব সরঞ্জাম তৈরির লক্ষ্য থাকে মানুষের শ্রম কমানো বা সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা।

কিন্তু রূপা সরকারের মতে, সিস্টেম্যাটিক রিভিউ মানেই শুধুমাত্র তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ নয়।এর জন্য প্রয়োজন গবেষণাসংক্রান্ত প্রশ্ন নির্ধারণের দক্ষতা, প্রাসঙ্গিকতা বিচার করার ক্ষমতা, ফলাফলের যথাযথ ব্যাখ্যা এবং নীতিগত বা চিকিৎসাগত প্রভাব বোঝার মতো মানবিক বিচারবোধ।এসব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় এআই এখনো যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে নি।তাছাড়া এআই-এর একটি বড় সমস্যা হলো হ্যালুসিনেশন/বিভ্রম। অর্থাৎ বাস্তবে নেই এমন তথ্য বা উদ্ধৃতি তৈরি করে ফেলা।ফলে এআই-এর তৈরি ফলাফল সবসময় মানুষ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যাচাই করানো জরুরি।

কোকরেন সংস্থার অভিজ্ঞতাও এই সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করেছে। তারা গবেষণা বাছাই এবং তথ্য আহরণের জন্য বিভিন্ন এআই সরঞ্জাম পরীক্ষা করেছে।কিন্তু দেখা গেছে, অধিকাংশ সরঞ্জাম বেসরকারি কোম্পানির তৈরি এবং তাদের কার্যপ্রণালী স্বচ্ছ নয়। বিশেষ করে ওষুধ বা চিকিৎসা-যন্ত্রের কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সমস্যা, কারণ পর্যালোচনাগুলোকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হয়। অনেক এআই মডেল “ব্ল্যাক বক্স” পদ্ধতিতে কাজ করে, ফলে বোঝা যায় না কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির পক্ষে ফলাফল পক্ষপাতদুষ্ট হচ্ছে কি না।

আরও একটি বাস্তব সমস্যা হলো, এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করার আগে এআই মডেল ও ব্যবহারকারী উভয়েরই দীর্ঘ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।কোকরেনের পরীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করে নির্ভরযোগ্য ফলাফল পেতে যে সময় লাগে, তা হাতে হাতে কাজ করার তুলনায় অনেক বেশি সময়।

রূপা সরকারের মতে, ভবিষ্যতে এআই-এর প্রকৃত সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে এটিকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ এআই গবেষণা বিশ্লেষণে সহায়তা করবে, কিন্তু চূড়ান্ত মূল্যায়ন, ব্যাখ্যা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব থাকবে মানুষ বিশেষজ্ঞদের হাতে। কারণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের গভীরতা, প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষমতা এবং সমালোচনামূলক বিচারবোধ—এসব গুণ এখনো মানুষের মধ্যেই সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে বিদ্যমান।

 

সূত্র: nature.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − 13 =