কঠিনে কোমলে অনন্য হস্তিশুণ্ড 

কঠিনে কোমলে অনন্য হস্তিশুণ্ড 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ জুন, ২০২৬

হাতির শুঁড় প্রকৃতির এক বিস্ময়। এটি সহজেই একটি ভারী গাছের গুঁড়ি টেনে সরাতে পারে, আবার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটি কলার খোসাও ছাড়িয়ে নিতে পারে। বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা শুঁড়ের এই শক্তি ও নমনীয়তার রহস্য খুঁজছেন। এখন জানা যাচ্ছে আসলে শুঁড়ের চামড়াই এদের অসাধারণত্বের চাবিকাঠি। ইতালির জেনোয়ায় অবস্থিত ইতালিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক লুসিয়া বেক্কাই এবং তাঁর সহকর্মীদের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাতির শুঁড়ের চামড়া দুটি ভিন্ন অংশে বিভক্ত। উপরের অংশটি শক্ত ও সুরক্ষামূলক। আর নীচের অংশটি নরম ও স্পর্শ-সংবেদী। এই বিশেষ গঠনই শুঁড়কে একই সঙ্গে শক্তিশালী এবং কোমল করে তুলেছে। গবেষকরা ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডের একটি চিড়িয়াখানায় স্বাভাবিকভাবে মৃত একটি এশীয় হাতির শুঁড় নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করেন। তাঁরা শুঁড়ের বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তার দৃঢ়তা পরীক্ষা করেন এবং অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে টিস্যুর গঠন বিশ্লেষণ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, শুঁড়ের উপরের অংশের চামড়া নীচের অংশের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি শক্ত। এটি অপেক্ষাকৃত মোটা ও খসখসে। এই অংশটিই সাধারণত গাছের বাকল, ডালপালা বা মাটির মতো রুক্ষ বস্তুর সঙ্গে বেশি ঘর্ষণের মুখোমুখি হয়। ফলে শক্ত চামড়া একটি সুরক্ষাকবচের মতো কাজ করে এবং ভেতরের কোমল টিস্যুকে রক্ষা করে। অন্যদিকে, শুঁড়ের নীচের অংশের চামড়া অনেক বেশি নরম ও নমনীয়। কোনও বস্তু ধরার সময় এটি সেই বস্তুর আকৃতির সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ফলে হাতি খুব সূক্ষ্ম ও সতর্কভাবে বিভিন্ন জিনিস ধরতে সক্ষম হয়। কলার খোসা ছাড়ানো বা ছোট বস্তু তুলে নেওয়ার মতো কাজেও এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে শুঁড়ের নীচের চামড়ার ভেতরে থাকা বিশেষ গঠনটি খুব অদ্ভুত। সেখানে গবেষকরা ‘ডার্মাল প্যাপিলা’ নামে ছোট ছোট গম্বুজাকৃতির তিল দেখতে পান। উপরের চামড়ায় এগুলোর উপস্থিতি খুবই কম হলেও নীচের অংশে এগুলো ঘনভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। কম্পিউটার মডেলের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এই গম্বুজাকৃতির তিলগুলো স্পর্শের চাপকে কেন্দ্রীভূত করে নীচে থাকা স্নায়ুর দিকে পাঠায়। ফলে খুব হালকা স্পর্শও স্নায়ুতে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী সংকেত হিসেবে পৌঁছায়। এর ফলে হাতির শুঁড় অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্পর্শও অনুভব করতে পারে। তাই স্পর্শশক্তি বাড়ানোর জন্য হাতির শরীরে অতিরিক্ত উন্নত স্নায়ুতন্ত্রের প্রয়োজন হয়নি। বরং চামড়ার ওই বিশেষ গঠনই তার সাধারণ স্নায়ুকে আরও কার্যকর করে তুলেছে। মানুষের আঙুলের ডগার সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের নীতি কাজ করে। এই ফলাফল শুধু প্রাণীবিজ্ঞানের জন্য নয়, রোবট প্রযুক্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এমন রোবট তৈরি করার চেষ্টা চলছে, যা একদিকে শক্তপোক্ত হবে, অন্যদিকে ভঙ্গুর বস্তু সাবধানে ধরতে পারবে। হাতির শুঁড়ের এই দ্বৈত নকশা সেই কাজে নতুন ধারণা দিতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতের রোবটিক গ্রিপার বা কৃত্রিম মুষ্টি এমনভাবে তৈরি করা যেতে পারে, যাতে এক অংশে শক্ত সুরক্ষামূলক আবরণ এবং অন্য অংশে নরম স্পর্শ-সংবেদী পৃষ্ঠ থাকে। পাশাপাশি সেন্সরের উপরে গম্বুজাকৃতি তিলের গঠন যুক্ত করলে স্পর্শের ক্ষীণ সংকেতও আরও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। গবেষণাটি একটি মাত্র হাতির শুঁড়ের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, তবু এটি হাতির শুঁড়ের বিস্ময়কর ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে।

 

সূত্র : Functional anisotropy of the elephant trunk skin: A biological blueprint for grasping, protection, and tactile sensing; PNAS Nexus, Volume 5, Issue 6, June 2026, pgag164,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − 2 =