কলকাতা শহর যেমন ধীরে ধীরে আড়ে বহরে বিস্তৃত হয়েছে, তেমনই তার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত চেহারাও বদলেছে। নতুন বাড়ি, রাস্তা ও মানুষের ভিড়ে শহরটি ক্রমশ কোলাহলমুখর জমজমাট হয়ে উঠলেও, ব্যস্ত রাস্তাঘাট, ট্রামলাইন আর পুরোনো বাড়ির ফাঁকে ফাঁকে যে সবুজ ছায়া চোখে পড়ে, তার সবটাই কিন্তু এই ভারতের ভূমিসুতা নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের প্রায় অর্ধেক গাছই বিদেশি প্রজাতির, যারা অন্য দেশ থেকে এসে এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। ধরিত্রী দিবস উপলক্ষে এমনই পাঁচটি অ-স্থানীয় গাছের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো আজ কলকাতার পরিবেশের অংশ হয়ে উঠেছে, যদিও এদের শিকড় ভিন দেশে।
প্রথমেই আসে আফ্রিকার বিখ্যাত বাওবাব গাছ, যা আলিপুর চিড়িয়াখানায় দেখা যায়। “ট্রি অফ লাইফ” নামে পরিচিত এই গাছ তার বিশাল গঠন ও দীর্ঘায়ুর জন্য বিখ্যাত। এটি মাটির আর্দ্রতা বজায় রাখতে, পুষ্টির পুনর্ব্যবহার করতে এবং মাটির ক্ষয় রোধে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ধারণা করা হয়, এই গাছটি ১৯৪০-এর দশকে লাগানো হয়েছিল এবং এখনও সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে। কলকাতার আর্দ্র আবহাওয়াতেও এটি দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। এই গাছ প্রকৃতির অভিযোজনের এক অসাধারণ উদাহরণ।
দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ আমেরিকার বৃষ্টি-অরণ্যের বাসিন্দা ক্যাননবল গাছ (Couroupita guianensis) পাওয়া যায় রবীন্দ্র সরোবরের শিশু উদ্যান এলাকায়। এর অদ্ভুত গোলাকার ফল এবং সুগন্ধি ফুলের জন্য এই গাছ আর পাঁচটা গাছের চেয়ে আলাদা। ফুলের গন্ধ এতটাই তীব্র যে কারও কাছে তা মুগ্ধকর, আবার কারও কাছে বিরক্তিকর। যদিও এর ফুল দেখতে শিবলিঙ্গের মতো বলে এটি নাগলিঙ্গম নামে পরিচিত, কিন্তু এটি স্থানীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয় না।
তৃতীয়ত, একটু এগোলেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে
প্রাঙ্গণে দেখা মেলে মেক্সিকান ক্যালাবাশ গাছের। গাছের কাণ্ড থেকেই সরাসরি ফুল ও ফল জন্মায়। এ দেখতে অদ্ভুত হলেও প্রকৃতির বিচিত্র সৃজনশীলতার এক অনন্য নিদর্শন। মেক্সিকো ও গুয়াতেমালার শুষ্ক অঞ্চলের এই গাছ উনিশ শতকের শেষদিকে কলকাতায় আনা হয়। এই গাছ কলকাতার মাটিতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে বহু আগেই।
চতুর্থত, ব্রাজিলের আয়রনউড (Libidibia ferrea ) গাছের অবস্থানও আলিপুর চিড়িয়াখানায়। এর ঝুলন্ত ডাল, দ্বিগুণ পত্রগঠন এবং বিশেষ ধরনের ছাল এটিকে চেনার সহজ উপায়। আমাজন অঞ্চলে এই গাছের ঔষধি ব্যবহারও রয়েছে।
পঞ্চমত , মহুয়া গাছ (Madhuca longifolia)। যদিও এটি ভারতের কিছু অঞ্চলের স্থানীয়, কলকাতায় কিন্তু খুবই বিরল। তোপসিয়াতে একটি মহুয়া গাছ রয়েছে, যার মিষ্টি সুবাস বসন্তকালে চারপাশ ভরিয়ে দেয়। যদিও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এটির ব্যাপক উপস্থিতি, কলকাতায় তার উপস্থিতি একপ্রকার ব্যতিক্রমী ঘটনাই বটে।
এই গাছগুলোর অবস্থান দেখে একটা জিনিস বোঝা গেল যে প্রকৃতির কোনো বাঁধাধরা সীমানা নেই। মানুষ যেমন ভিনদেশে গিয়ে নতুন করে জীবনটাকে গুছিয়ে সেই পরিবেশের সাথে মানিয় নেওয়ার চেষ্টা করে, তেমনই গাছও পারে নতুন মাটিতে শিকড় গেড়ে নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। কলকাতার এই অ-স্থানীয় গাছগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক শিকড় থাকা সত্ত্বেও প্রকৃতি নিজেই অভিযোজনের মাধ্যমে নতুন পরিবেশে এদের টিকিয়ে থাকতে পারে, এবং একসময় তারা সেই পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
সূত্র: Family roots elsewhere, but planted solidly in Kolkata: Five non-native trees in the city by Mohul Bhattacharya,Published 22.04.26, 01:48 PM.
