কাশ্মীরে বন্য শূকরের প্রত্যাবর্তন 

কাশ্মীরে বন্য শূকরের প্রত্যাবর্তন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ জুলাই, ২০২৬

কাশ্মীরের উত্তরাঞ্চলের পাট্টন এলাকার কৃষক আবদুল হামিদ এক সকালে নিজের মটরক্ষেতে গিয়ে দেখেন, কয়েকদিন আগে বোনা বীজের সারি সম্পূর্ণ নষ্ট। মাটি উলটে গেছে, সর্বত্র পায়ের দাগ, আর কাদায় ছড়িয়ে রয়েছে বীজ। যেন রাতারাতি কোনো ভারী যন্ত্র দিয়ে পুরো জমি কর্ষণ করা হয়েছে। এধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা জানাচ্ছেন, ধানের চারা, আলুর ক্ষেত এবং আপেল গাছের কচি বাকল বারবার নষ্ট করছে এক অপ্রত্যাশিত আগন্তুক – বন্য শূকর। একসময় কাশ্মীর থেকে এটি প্রায় বিলুপ্ত বলে মনে করা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সেটি ফিরে এসেছে। কম ঠাণ্ডা ও কম তুষারপাত এদের দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। তারই প্রভাব পড়ছে কৃষি ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে। ইতিহাস বলছে, বন্য শূকর কাশ্মীরের স্থানীয় প্রাণী নয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন শাসক মহারাজা গুলাব সিং শিকার করার উদ্দেশ্যে এদের বর্তমান দাচিগাম জাতীয় উদ্যানের আশপাশে ছেড়ে দেন। পরে দীর্ঘ সময় তারা বনাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ১৯৮৪ সালের পর থেকে এগুলিকে আর দেখা না যাওয়ায়, অনেকেই ধরে নেন, কাশ্মীরে এরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ২০১৩ সালে উত্তর কাশ্মীরের কাজিনাগ এলাকায় একটি মৃত বন্য শূকর উদ্ধার হয়। একই বছরে দাচিগামে ক্যামেরা ট্র্যাপে তাদের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এরপর থেকেই দ্রুত বাড়তে থাকে তাদের সংখ্যা। এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। গত একশ বছরে কাশ্মীরের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে শীতের তীব্রতা কমেছে এবং শীতকালও আগের তুলনায় ছোট হয়ে এসেছে। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে কাশ্মীরের দিনের বেলা তাপমাত্রা ছিল ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৯ থেকে ১১ ডিগ্রি বেশি। একই সঙ্গে শ্রীনগরে ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ৫.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা ১৯৬০ সালের পর সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, কনকনে শীত না থাকায় বন্য শূকরের বেঁচে থাকার হার বেড়েছে। পর্যাপ্ত খাবার পেলে একটি মেয়ে বুনো শূকর বছরে কয়েক বার বাচ্চা দিতে পারে এবং প্রতিবারে ছয় থেকে ১২টি পর্যন্ত শাবকের জন্ম দেয়। ফলে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সরকারি কোনও হিসেব না থাকলেও বন দপ্তরের ধারণা, কাশ্মীরে বর্তমানে ২০০ থেকে ২৫০টি বন্য শূকর রয়েছে। তবে জরিপকারীদের মতে, এদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকেরা। বান্দিপোরার হাজিন, আশাম ও ইন্দরকোট এলাকায় ধানের চারা ও আলুর খেত বারবার নষ্ট হচ্ছে। অনেক কৃষকের দাবি, এক মৌসুমে উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। কেউ কেউ চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন। শব্দতরঙ্গ নির্ভর যন্ত্র, রাত পাহারা বা বিভিন্ন ঘরোয়া পদ্ধতিও খুব একটা কাজে আসছে না। ফলে কৃষকদের উদ্বেগ বাড়ছে। সমস্যা শুধু কৃষিজমিতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি বন্য শূকর ত্রালের বাজারে ঢুকে কয়েকজনকে জখম করে। পরে শ্রীনগরের বিভিন্ন এলাকাতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ দাচিগাম জাতীয় উদ্যানের হাঙ্গুল বা কাশ্মীরি হরিণকে ঘিরে। বন্য শূকর ও হাঙ্গুল একই ধরনের খাদ্য ও আবাসস্থল ব্যবহার করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বন্য শূকর মাটি খুঁড়ে খাদ্য খোঁজার সময় অনেক ঘাস ও ছোট গাছপালা নষ্ট করে, যা হাঙ্গুলের খাদ্যসংকট তৈরি করতে পারে। এমনকি হাঙ্গুল শাবকদের ওপরও আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। বন্যপ্রাণী কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রাণীকে ধরে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়াও সহজ নয়। শক্তিশালী শরীর ও ধারালো দাঁতের কারণে পূর্ণবয়স্ক বন্য শূকর অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাশ্মীরে বন্য শূকরের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি বন্যপ্রাণীর ফিরে আসার গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র বদলে দিচ্ছে, যে -পরিবর্তনের বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করতে হচ্ছে কৃষক ও স্থানীয় মানুষদের।

সূত্র: Down to Earth ; July ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + 10 =