কিপ এস. থর্ন : গতি নয়, গভীরতা 

কিপ এস. থর্ন : গতি নয়, গভীরতা 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

খুব দ্রুত ভাবতে পারাই বড় সাফল্য অর্জনের নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ, দ্রুত চিন্তা করাই মেধার একমাত্র পরিচয় নয়। পদার্থবিদ কিপ এস. থর্নের জীবন তারই এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। ছাত্রজীবনে এবং পরবর্তীতে তিনি তাঁর সহপাঠী বা সহকর্মীদের মতো চটপট কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারতেন না। কিন্তু তাঁর একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল। তিনি যেকোনো সমস্যার গভীরে গিয়ে তার প্রকৃত কাঠামো ও সম্ভাবনাকে আগে বোঝার চেষ্টা করতেন। এই গভীর অন্তর্দৃষ্টিই শেষ পর্যন্ত তাঁকে মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণের অন্যতম প্রধান কারিগর করে তোলে।

১৯৪০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা অঙ্গরাজ্যে থর্নের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বরাবরই তিনি শান্ত, ধীরস্থির ও মনোযোগী স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সংখ্যার মাধ্যমে কীভাবে প্রকৃতির নানা ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায়, সেটা তাঁকে আকৃষ্ট করত। পরে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে স্নাতক পড়তে এসে তিনি এমন কিছু সহপাঠীর সংস্পর্শে আসেন, যাঁরা তাঁর তুলনায় চিন্তায় ও কাজে অনেক দ্রুত। তাঁরা যখন একটি সমস্যার সমাধান শেষ করে ফেলছেন, থর্ন তখনও হয়তো সমস্যাটির প্রথম অংশটি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।

তিনি নিজের এই ধীরগতির বিষয়টি জানতেন এবং সেটি কখনো লুকানোর চেষ্টাও করেননি। বরং নিজের কাজের ধরনকে তিনি সেই অনুযায়ী বদলে নেন। তিনি দ্রুত অনেক বিষয় পড়ার পরিবর্তে অল্প কিছু বিষয় গভীরভাবে পড়তেন। একই সমস্যাকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে বারবার বিশ্লেষণ করতেন। তাঁর চিন্তা ও পর্যবেক্ষণগুলি ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত যত্নসহকারে নোট লিখতেন। অর্থাৎ, যা তিনি একসঙ্গে মনের মধ্যে ধরে রাখতে পারতেন না, সেগুলো নোটবইয়ে লিখে রাখতেন। ওটাই তাঁর বাহ্যিক স্মৃতিভাণ্ডার হয়ে উঠেছিল।

এই পদ্ধতি তাঁকে অন্যদের গতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পরিবর্তে নিজের শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেয়। তাঁর অধ্যাপকরাও প্রথম দিকে তাঁকে নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলেন না। কারণ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় দ্রুত সমস্যার সমাধান করা, পরীক্ষায় দ্রুত উত্তর দেওয়া বা অল্প সময়ে অনেক কিছু আয়ত্ত করা, এসবকেই মেধার এক এবং অদ্বিতীয় সূচক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু থর্নের ক্ষেত্রে এই মাপকাঠিগুলি তাঁর প্রকৃত সামর্থ্যকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারেনি।

সময়ের সঙ্গে থর্ন নিজের ভিতরে এমন এক ক্ষমতা গড়ে তুলেছিলেন, যা কেবল দ্রুত পড়াশোনা বা দ্রুত হিসাব করার মাধ্যমে অর্জন করা যায় না। তা হল বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি। কোনও সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত থাকা, একই প্রশ্নকে নানা দিক থেকে দেখা এবং তার অন্তর্নিহিত কাঠামো উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে তিনি যেকোনো সমস্যাকে একপ্রকার অনুভব করতে পারতেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর গবেষণায় এই গভীর অন্তর্দৃষ্টিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

থর্ন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত পদার্থবিদ জন আর্চিবাল্ড হুইলারের অধীনে পিএইচ ডি সম্পন্ন করেন। হুইলার ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ ও মহাকর্ষ নিয়ে গবেষণায় তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। পরে থর্ন ক্যালটেকে অধ্যাপক হিসেবে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি কয়েক দশক ধরে এমন একটি বৈজ্ঞানিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, যেটিকে অনেক পদার্থবিদ অত্যন্ত কঠিন, এমনকি প্রায় সমাধানের অযোগ্য বলে মনে করতেন। তিনি মহাকর্ষ তরঙ্গ সরাসরি শনাক্ত করেন।

আলবার্ট আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী, মহাকর্ষ কোনও অদৃশ্য শক্তি নয়। ভর ও শক্তির উপস্থিতিতে স্থান-কালের কাঠামোই বেঁকে যায়। অত্যন্ত শক্তিশালী মহাজাগতিক ঘটনা , যেমন দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ, এই স্থানকালের নিরিখে ঢেউয়ের মতো তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। এগুলিই মহাকর্ষ তরঙ্গ। আইনস্টাইন ১৯১৬ সালেই এই তরঙ্গের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এগুলিকে সরাসরি শনাক্ত করা যাবে কি না, তা নিয়ে তিনিও যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন।

এই ক্ষীণ তরঙ্গ শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি যন্ত্র। সেই প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই গড়ে ওঠে LIGO বা Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory। ধারণা থেকে নির্ভরযোগ্য শনাক্তকরণ পর্যন্ত এই প্রকল্পের পেছনে প্রায় চার দশক সময় লেগেছিল। কিপ থর্ন ছিলেন সেই তিন বিজ্ঞানীর অন্যতম, যাঁদের দীর্ঘ গবেষণা ও প্রচেষ্টার ফলে এই ঐতিহাসিক সাফল্য সম্ভব হয়।

২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর LIGO প্রথমবারের মতো একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করে। তরঙ্গটির উৎস ছিল পৃথিবী থেকে প্রায় ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ ও একীভবন। ঘটনাটি থেকে উৎপন্ন তরঙ্গ পৃথিবীতে পৌঁছানোর সময় তার প্রভাব এতটাই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল যে LIGO-তে পরিমাপ করা স্থান-কালের বিকৃতি ছিল প্রোটনের প্রস্থেরও একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। তবু অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি এবং দীর্ঘদিনের তাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা সেই সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম হন।

এই আবিষ্কার নতুন মহাজাগতিক তরঙ্গ শনাক্ত করার পাশাপাশি, মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের সম্পূর্ণ এক নতুন পথ খুলে দেয়। এতদিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মূলত আলো বা তড়িৎচুম্বক বিকিরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বকে দেখতেন। মহাকর্ষ তরঙ্গের সাহায্যে প্রথমবারের মতো মহাবিশ্বের অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ঘটনাগুলিকে অন্য এক উপায়ে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হল।

২০১৭ সালে কিপ থর্ন, রেইনার ভাইস এবং ব্যারি ব্যারিশ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণে মুখ্য অবদানের জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁদের সাফল্য দেখিয়ে দেয়, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দ্রুততা সবসময় সবচেয়ে বড় শক্তি নয়। কখনও কখনও একটি প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন লেগে থাকার, ধৈর্য ধরে বারবার চিন্তা করার এবং গভীরে পৌঁছানোর ক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সহজ কথায় বলতে গেলে, নোবেলজয়ী পদার্থবিদ কিপ থর্ন নিজের ধীরগতিকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে নিজের কাজের ধরনকে তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। অন্যরা যখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল, তিনি ধীরে চলছিলেন; কিন্তু থামেননি। চার দশকের অধ্যবসায়ে সেই ধীর, গভীর অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত এমন এক সংকেত ধরেছিল, যার অস্তিত্বের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন আইনস্টাইন প্রায় এক শতাব্দী আগে।

 

 

সূত্রঃ “Kip S. Thorne EM1B8790 (24027017497)” by Bengt Nyman from Vaxholm, Sweden · CC BY 2.0 · via Wikimedia Commons

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + five =