কুকুরের হৃৎপিণ্ডে ‘স্প্যাগেটি’ কৃমি 

কুকুরের হৃৎপিণ্ডে ‘স্প্যাগেটি’ কৃমি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ এপ্রিল, ২০২৬

কুকুরের শরীরে বাসা বাঁধা সবচেয়ে বিপজ্জনক পরজীবীদের মধ্যে অন্যতম হল হৃৎ-কৃমি বা হার্টওয়ার্ম। এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, গৃহপালিত কুকুরেরা মানুষের সংস্পর্শে থাকে বলে নাকি এই পরজীবী ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনি-র সাম্প্রতিক গবেষণা সেই অবান্তর ধারণার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন বিশ্লেষণ বলছে, এই হার্টওয়ার্মের ইতিহাস অনেক প্রাচীন।

হার্টওয়ার্ম রোগের জন্য দায়ী Dirofilaria immitis নামের এক ধরনের পরজীবী কৃমি, যা মশার মাধ্যমে কুকুরের শরীরে প্রবেশ করে। চিকিৎসা না হলে এটি কুকুরের হৃৎপিণ্ডে ও ফুসফুসের রক্তনালিতে বাসা বাঁধে এবং প্রাণঘাতী হতে পারে। পূর্ণবয়স্ক হৃৎ-কৃমিগুলো দেখতে অনেকটা লম্বা স্প্যাগেটির মতো, দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার।

গবেষকরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ১০০টিরও বেশি হার্টওয়ার্মের জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। তাতে দেখা যায়, এই পরজীবীর বিস্তার কেবল আধুনিক যুগে মানুষের মাধ্যমে ঘটেনি। বরং হাজার হাজার বছর আগে নেকড়ে, ডিঙ্গো/ বন্য কুকুর ও অন্যান্য বন্য কুকুর জাতীয় প্রাণীর ভূমিকা হার্টওয়ার্মের বিস্তারে বড় ছিল। অর্থাৎ, মানুষের আগেই কুকুরজাতীয় প্রাণীদের সঙ্গে সহ-বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এই কৃমির।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্য হল, গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, অস্ট্রেলিয়ার হার্টওয়ার্মের সঙ্গে এশিয়ার হার্টওয়ার্মের জিনগত মিল রয়েছে। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, হাজার হাজার বছর আগে এশিয়া থেকে যখন ডিঙ্গো/ বন্য কুকুর অস্ট্রেলিয়ায় আসে, তখনই হয়তো এই পরজীবীও সেখানে পৌঁছায়। অবশ্য গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এ বিষয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন; এমনও হতে পারে যে ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের পরে এটি অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিল।

এই গবেষণার আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো চিকিৎসা ব্যবস্থায়। বিশ্বের কিছু অঞ্চলে হার্টওয়ার্মের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ওষুধে কৃমিদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখা যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সব অঞ্চলের হার্টওয়ার্ম একরকম নয়, তাদের জিনগত ইতিহাস আলাদা। তাই রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রেও স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল দরকার হতে পারে।

প্রধান গবেষক ড. রোজমন্ড পাওয়ার জানান, এতদিন হার্টওয়ার্মকে আধুনিক যুগের পরজীবী হিসেবে দেখা হলেও, এখন স্পষ্ট হচ্ছে এটি আসলে বহু প্রাচীন এক জীব, যা কুকুরজাতীয় প্রাণীদের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বিবর্তিত হয়েছে। কুকুরের হৃৎপিণ্ডে লুকিয়ে থাকা এই ‘স্প্যাগেটি কৃমি’ পৃথিবীর প্রাণীবিবর্তনেরও এক নীরব সাক্ষী। নতুন এই গবেষণা হার্টওয়ার্মের অতীত যেমন উন্মোচন করছে, তেমনি ভবিষ্যতের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কৌশলকেও নতুন পথ দেখাতে পারে।

 

সূত্র: “Population genomics reveals an ancient origin of heartworms in canids” by Rosemonde I. Power, Swaid Abdullah, et.al; 20 January 2026, Communications Biology. DOI: 10.1038/s42003-025-09250-x

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five − 3 =