কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে নিরাপত্তার লাগাম 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌড়ে নিরাপত্তার লাগাম 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন এক প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার সুফল যেমন বিপুল, ঝুঁকিও তেমন গভীর। চিকিৎসা থেকে গবেষণা, শিক্ষা থেকে অর্থনীতি, সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেই চলেছে। কিন্তু একই সঙ্গে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো নিজেরাই সাইবার নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টা করছে, ভুয়ো পরিচয় তৈরি করছে এবং মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা দেখাচ্ছে। আচ্ছা কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি বজায় রেখে তার বিপজ্জনক দিকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না?

নেচার পত্রিকার ২৫শে আগস্ট ২০২৬-এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, উল্লিখিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের AI Act-এ ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও আইন প্রয়োগে ব্যবহৃত উচ্চঝুঁকির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও মানবীয় নজরদারি বাধ্যতামূলক। মানুষের স্পর্শকাতর বৈশিষ্ট্য অনুমানের মতো কিছু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধও করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরীক্ষায় OpenAI, Anthropic ও Meta-র তৈরি কয়েকটি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল স্বাধীনভাবে অন্য প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করেছে। কিছু মডেল আবার ভুয়ো অনলাইন পরিচয় তৈরি করে নিরাপত্তার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে। এসব ঘটনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য অপব্যবহার, প্রতারণা এবং বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। সেই কারণে আরও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এসেছে উন্নত বা ফ্রন্টিয়ার AI মডেলের ক্ষেত্রে। যেসব মডেল বৃহৎ পরিসরে ক্ষতি করতে পারে, তাদের নির্মাতাদের প্রশিক্ষণ-তথ্য, পদ্ধতি, কপিরাইট মেনে চলা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে নিয়ন্ত্রকদের তথ্য দিতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন প্রতারণা করতে , বিভ্রান্তি ছড়াতে বা জনমতকে বিপজ্জনকভাবে প্রভাবিত করতে না পারে, সেটিও নজরদারির আওতায় এসেছে।

২ আগস্ট থেকে European AI Office বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পেয়েছে। আইন ভাঙলে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অথবা প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক বার্ষিক আয়ের ৩ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলকে ইউরোপীয় বাজার থেকে খর্ব বা প্রত্যাহারের উদ্যোগও নেওয়া সম্ভব।

তবে ইউরোপ একা নয়। চীন ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্দিষ্ট নিয়ম, কনটেন্ট লেবেলিং ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের পথে এগোচ্ছে। একই সময়ে প্রায় ১,৪০০ জন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মী আন্তর্জাতিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের গতি কিছুটা কমিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-কে থামিয়ে দেওয়াটা সমাধান নয়; আবার লাগামহীন অগ্রগতিও নিরাপদ নয়। প্রয়োজন হল উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল সম্ভাবনা মানুষের কাজে লাগাতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

 

সূত্র: How to manage AI risks while reaping the benefits | Nature

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − seven =