কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবসভ্যতা 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবসভ্যতা 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১৮ জুলাই, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এ আই নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তিগত বিপ্লবগুলোর একটি। শিল্পবিপ্লব যেমন উৎপাদনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছিল, তেমনি এআই আজ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, প্রশাসন, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাঠামোকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। গত কয়েক বছরে এর অগ্রগতি এত দ্রুত ঘটেছে যে এটি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকেই প্রভাবিত করছে। ChatGPT-এর মতো জেনারেটিভ এআই প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা দেখিয়েছে যে উন্নত প্রযুক্তি এখন আর কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নয়। আজকেরদিনে এই এ আই কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে এই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর নৈতিকতা, নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ এবং মানবসভ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এআই মূলত মানব বুদ্ধিমত্তার কিছু ক্ষেত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সম্পন্ন করতে পারে। যেমন কোনোকিছু শেখা, ভাষা বোঝা, ছবি শনাক্ত করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান করা এবং নতুন বিষয়বস্তু তৈরি করা ইত্যাদি। গত কয়েক দশক ধরে এই প্রযুক্তি চিকিৎসা, পরিবহন, শিক্ষা, বিনোদন, আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা, ব্যক্তিনির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা করা কিংবা ওষুধ আবিষ্কার প্রভৃতি কাজে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত শিক্ষণপদ্ধতি, স্মার্ট সহকারী এবং তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে শেখার মান উন্নত হচ্ছে। শিল্প ও ব্যবসায় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং জটিল কাজকে সহজ করতে এআই-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ।

ইতিবাচক ফলাফলের পাশাপাশি এই অগ্রগতিকে নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর উদ্বেগও সামনে এসেছে। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বহু প্রচলিত পেশা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারখানা, পরিবহন, ব্যাংকিং, এমনকি কিছু হোয়াইট-কলার পেশাতেও ( বেসরকারি অফিসের কাজ) মানুষের পরিবর্তে এআই ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। অবশ্য নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবুও এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিপুলসংখ্যক কর্মীর পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজন হবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক বৈষম্য হু হু করে বাড়বে বই কমবে না।

এআই ব্যবহারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অ্যালগরিদম ঘটিত পক্ষপাত। এআই তো বাস্তব বিশ্বের তথ্য থেকেই শেখে। যদি সেই তথ্যেই সামাজিক বৈষম্য, বর্ণভেদ, লিঙ্গবৈষম্য বা অন্য ধরনের পক্ষপাত থাকে, তাহলে এআইও সেই বৈষম্যেরই পুনরুৎপাদন করতে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ বা অন্যান্য বর্ণের মানুষের পরিচয় শনাক্ত করতে বেশি ভুল করে। চাকরিতে নিয়োগ, ঋণ প্রদান কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই ধরনের পক্ষপাত গুরুতর অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে।

সরকারগুলোর জন্যও এআই একদিকে সম্ভাবনার, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জের উৎস। অনেক দেশ সরকারি সেবা উন্নত করা, অপরাধ বিশ্লেষণ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে এআই ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিধর দেশগুলো এআই গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ করছে, কারণ তারা এটিকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে। ফলে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব অর্জনের প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং সামরিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের ওপর নৈতিক, স্বচ্ছ এবং দায়িত্বশীলভাবে এআই নিয়ন্ত্রণের চাপও বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এআই নতুন ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বা এআই-চালিত যুদ্ধব্যবস্থা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকদের মতে, এআই ভিত্তিক অস্ত্রের তিনটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, এটি দেশগুলোর জন্য যুদ্ধ শুরু করা আরও সহজ করে তুলতে পারে। দ্বিতীয়ত, শান্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে সামরিক কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। তৃতীয়ত, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দরুন যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের নৈতিক দায়িত্ব কমে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ আরও জটিল ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা ।

এআই আসলে মানবসভ্যতার মৌলিক ধারণাগুলোকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যদি কোনো যন্ত্র মানুষের মতো চিন্তা করতে, সৃজনশীল কাজ করতে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে মানুষের স্বাতন্ত্র্য কোথায়? ভবিষ্যতে যদি অর্থনীতি পরিচালনা, আদালতের রায়, কিংবা সামরিক সিদ্ধান্তও এআই গ্রহণ করতে শুরু করে, তাহলে মানুষের ভূমিকা কতটা থাকবে? এই প্রশ্নগুলো শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এগুলো দর্শন, নৈতিকতা এবং সামাজিক কাঠামোর সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

আবার আরেকদিক থেকে এআইয়ের অপব্যবহারের আশঙ্কাও কম নয়। অনেকেই মনে করেন, সরকার বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী গণনজরদারি, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় সেন্সরশিপের মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে। একই সঙ্গে নকল ভিডিও, ভুয়ো সংবাদ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রচারণা ব্যবস্থার মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করা কিংবা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে তথ্যের সত্যতা যাচাই ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তবে এআইয়ের ইতিবাচক সম্ভাবনা অসীম। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মহামারির পূর্বাভাস, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার গতি বাড়াতে এআই অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশাল পরিমাণ তথ্য অল্প সময়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কারের পথ খুলে দিতে পারে এবং মানবজাতির বহু জটিল সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে।

মানবসভ্যতার ইতিহাস বলছে, প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সময়ই ভয় ও অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। কৃষিভিত্তিক সমাজের বিকাশ, শিল্পবিপ্লব কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তির আগমন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ প্রথমে কর্মসংস্থান, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। শিল্পবিপ্লবের সময়ও যন্ত্র মানুষের কাজ কেড়ে নেবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। বাস্তবে যন্ত্র উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও এর সুবিধা মূলত কারখানার মালিক ও বিনিয়োগকারীরাই বেশি পেয়েছিলেন। বর্তমানেও তার অন্যথা হচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন, মানুষ কি প্রযুক্তিকে ভয় পাচ্ছে, নাকি প্রযুক্তির ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেটিকেই বেশি ভয় পাচ্ছে?

এআই-কেন্দ্রিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। অধিকাংশ এআই ব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল। স্মার্টফোন, ভার্চুয়াল সহকারী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা হচ্ছে। ব্যবহারকারীরা প্রায়ই জানেন না তাদের তথ্য কীভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা না থাকলে এই তথ্য নজরদারি, বাণিজ্যিক অপব্যবহার কিংবা সাইবার হামলার শিকার হতে পারে, যা ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য গুরুতর বিপদ।

জবাবদিহির বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি একটি স্বয়ংচালিত গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটায়, অথবা কোনো এআইভিত্তিক সিদ্ধান্ত মানুষের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে দায় কার? সফটওয়্যার নির্মাতা, গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, নাকি ব্যবহারকারীর? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। এই আইনি ও নৈতিক অস্পষ্টতা ভবিষ্যতের আইন প্রণয়নকে আরও জটিল করে তুলছে।

 

মনে রাখতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কোনো নৈতিক সত্তা নয়, এটি একটি শক্তিশালী প্রযুক্তিগত হাতিয়ার মাত্র। এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে মানুষ কীভাবে একে ব্যবহার করে, কার স্বার্থে এটি পরিচালিত হয় এবং এর ওপর কী ধরনের নৈতিক ও আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় তার ওপর। যদি স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির ভিত্তিতে এআইকে পরিচালনা করা যায়, তাহলে এটি মানবসভ্যতার উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি এটি কেবল ক্ষমতা, মুনাফা বা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে বৈষম্য, সংঘাত এবং সামাজিক বিভাজন আরও বাড়তে পারে।

অতএব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির হাতে নয়, বরং মানুষের বিচক্ষণতা, নৈতিক প্রজ্ঞা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সচেতন সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আজ আমরা যে নীতি, আইন এবং মূল্যবোধ নির্ধারণ করব, সেটিই ঠিক করবে ভবিষ্যতের এআই মানবসভ্যতার মুক্তির পথ তৈরি করবে, নাকি নতুন সংকটের সূচনা করবে।

সূত্র: Artificial Intelligence and Civilization – The Science Survey, july3rd,2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 5 =