কৃবু কি আমাদের দক্ষতা কমাচ্ছে? 

কৃবু কি আমাদের দক্ষতা কমাচ্ছে? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ জুন, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন দ্রুত চিকিৎসা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং অন্যান্য পেশায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটা নতুন উদ্বেগও সামনে আসছে। তাহলে মানুষ কি সত্যিই ধীরে ধীরে নিজেদের দক্ষতা হারিয়ে ফেলছে? সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো থেকে যা ইঙ্গিত মিলছে তাতে বোঝা যাচ্ছে কৃবু-র ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পেশাগত দক্ষতার অবক্ষয় ঘটাতে চলেছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ নার্স এবং ৭৭ শতাংশ চিকিৎসকের আশঙ্কা, কৃবু-র অতিরিক্ত ব্যবহার তাঁদের নিজস্ব দক্ষতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এবার, নতুন গবেষণাগুলোও বলছে, এই আশঙ্কা পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়।

এর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উদাহরণ এসেছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি গবেষণা থেকে। পোল্যান্ডের এন্ডোস্কোপি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে পরিচালিত এই গবেষণায় এমন একটি কৃবু সিস্টেম ব্যবহার করা হয়, যা কোলনোস্কোপির সময় অন্ত্রে থাকা অ্যাডেনোমা নামক ক্যান্সার-পূর্ব ক্ষত শনাক্ত করতে সাহায্য করে। গবেষণায় অংশ নেওয়া চিকিৎসকেরা প্রত্যেকেই তাঁদের কর্মজীবনে অন্তত ২,০০০টি কোলনোস্কোপি করেছিলেন, অর্থাৎ স্বভাবতই তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ।

কিন্তু গবেষণার ফলাফল হল অত্যন্ত উদ্বেগজনক । কৃবু চালু হওয়ার আগে চিকিৎসকেরা ২৮.৪ শতাংশ কোলনোস্কোপিতে অন্তত একটি অ্যাডেনোমা শনাক্ত করতে সক্ষম হন। কিন্তু কৃবু ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর যখন তাঁদের কৃবু ছাড়া কাজ করতে হয়, তখন সঠিক শনাক্তকরণের হার কমে দাঁড়ায় ২২.৪ শতাংশে। অর্থাৎ, কৃবু-র সহায়তা না থাকায় তাঁদের নিজস্ব কর্মদক্ষতা আগের তুলনায় হঠাৎ কমে গেল।

গবেষকদের মতে, কৃবু-র ধারাবাহিক ব্যবহার চিকিৎসকদের মনোযোগ, প্রেরণা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা ধীরে ধীরে মেশিনের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন যে নিজস্ব বিশ্লেষণী দক্ষতা কম ব্যবহার করেন।

একই ধরনের প্রবণতা সফটওয়্যার প্রকৌশল ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। কৃবু প্রতিষ্ঠান আন্থ্রোপিকের গবেষকেরা ৫২ জন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা চালান। অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেককে কৃবু সহকারী ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়, আর বাকি অর্ধেককে শুধুমাত্র ইন্টারনেট ও নির্দেশিকা ব্যবহার করতে বলা হয়। এই গবেষণার লক্ষ্য ছিল এটাই বোঝা যে কৃবু-র সহায়তা কাজের গতি বাড়ালেও, ব্যবহারকারীরা আসলে নতুন কিছু শিখছেন কি না। প্রাথমিক ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে কৃবু অনেক ক্ষেত্রে কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করলেও, ব্যবহারকারীদের শেখার প্রক্রিয়া এবং সমস্যা সমাধানের স্বাধীন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতি গবেষকদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে: কৃবু-র সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি কীভাবে মানবিক দক্ষতা সংরক্ষণ করা যাবে? নিউ ইয়র্কের সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞানী কেভিন ক্রাউস্টনের মতে, কৃবু ব্যবহারের ফলে কোন দক্ষতাগুলো মানুষ ধরে রাখতে চায় এবং কোনগুলো প্রযুক্তির কাছে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত, এ বিষয়ে সচেতনভাবে ভাবা জরুরি।

গবেষকেরা সতর্ক করছেন যে, বর্তমানে অবক্ষয় প্রতিরোধের কোনো প্রতিষ্ঠিত সমাধান নেই। তাই আগামী দশকে এটি কৃবু গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। কৃবু নিঃসন্দেহে উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, কিন্তু যদি মানুষ নিজের মৌলিক দক্ষতা হারাতে শুরু করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সামাজিক ও পেশাগত প্রভাব মোটেই ভালোর দিকে যাবে না। ফলে কৃবু-কে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা এবং নিজের দক্ষতাকে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সক্রিয় রাখা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-01947-1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 1 =