বিশ্ব এখনও COVID-19 মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব কাটিয়ে উঠতে ব্যস্ত, ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই বিজ্ঞানীরা নিয়ে এলেন এক আশাব্যঞ্জক উদ্ভাবন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নকশা করা এমন একটি সর্বজনীন টিকা, যা শুধু বর্তমানের পরিচিত করোনা ভাইরাস নয়, ভবিষ্যতে আবির্ভূত হতে পারে এমন অজানা ভাইরাসের বিরুদ্ধেও সুরক্ষা দিতে সক্ষম হবে। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও বায়োটেক প্রতিষ্ঠান DIOSynVax-এর গবেষকদের তৈরি এই টিকাটি সম্প্রতি প্রথম মানব-পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় সফল হয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৯ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকের উপর টিকাটি নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে এবং কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এটি সত্যিই বিশ্বের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ।
এই টিকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রচলিত টিকার মতো কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাইরাসকে লক্ষ্য করে তৈরি নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত কম্পিউটার মডেলিং ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ সুপার-অ্যান্টিজেন তৈরি করেছেন। সেটি করোনা ভাইরাসের বৃহত্তর সারবেকোভাইরাস পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এই পরিবারের মধ্যেই রয়েছে COVID-19-এর জন্য দায়ী SARS-CoV-2, ২০০৩ সালের SARS ভাইরাস এবং বাদুড়ে পাওয়া করোনাভাইরাস, যেগুলো ভবিষ্যতে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে।
গবেষকদের মতে, এটি বিশ্বের প্রথম টিকা যার সক্রিয় উপাদানের নকশা সম্পূর্ণভাবে কম্পিউটার সিমুলেশন ও কৃ বু প্রযুক্তির সাহায্যে করা হয়েছে। মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া সারবেকোভাইরাসগুলোর জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো শনাক্ত করেন। এরপর সেই বৈশিষ্ট্যগুলো একত্র করেই একটি কৃত্রিম অ্যান্টিজেন তৈরি করা হয়, যা একই সঙ্গে বহু ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে পারে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, টিকাটি শুধু SARS-CoV-2 ও SARS-এর বিরুদ্ধেই নয়, এমন কয়েকটি বাদুড়-বাহিত ভাইরাসের বিরুদ্ধেও শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে যারা ভবিষ্যতে মহামারি সৃষ্টি করতে পারে। আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই টিকা সূচবিহীন মাইক্রোফ্লুইডিক জেট প্রযুক্তির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছে। ফলে যাদের ইনজেকশনের ভয় / ট্রিপানোফোবিয়া রয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। বৃহৎ পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনাও এতে সহজ হবে।
এই গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী অধ্যাপক জোনাথন হেনি মনে করেন, এই প্রযুক্তি টিকা উন্নয়নের ধারণাকেই বদলে দিতে পারে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা সাধারণত কোনো ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর তার বিরুদ্ধে টিকা তৈরি করেন। কিন্তু নতুন এই পদ্ধতি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ভাইরাসগুলোকেও মাথায় রেখে আগাম সুরক্ষা গড়ে তোলার সুযোগ দিচ্ছে। ফলে মানবসভ্যতা এই প্রথম মহামারির পেছনে না ছুটে, বরং তাকে আগেভাগেই প্রতিরোধ করার সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে।
বর্তমানে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা COVID-19-এর মতো ভাইরাস দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় টিকাকেও সেই অনুসারে নিয়মিত আধুনিক করতে হয়। কিন্তু এই নতুন পদ্ধতি ভাইরাসের মৌলিক ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্যকে নিশানা করে কাজ করে, ফলে নতুন বিকল্প তৈরি হলেও সুরক্ষা বজায় থাকার সম্ভাবনা বেশি।
যদিও টিকাটি এখনও জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয় এবং আরও বৃহৎ পরিসরের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা বাকি রয়েছে, তবু এর প্রাথমিক সাফল্য বিজ্ঞানীদের ব্যাপক আশাবাদী করেছে। এখন গবেষকরা বৃহত্তর দ্বিতীয় পর্বের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদি পরবর্তী ধাপগুলোতেও সাফল্য আসে, তবে এই প্রযুক্তি শুধু করোনাভাইরাস নয়, ইবোলা ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অন্যান্য বিপজ্জনক ভাইরাসের বিরুদ্ধেও সর্বজনীন টিকা তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে মহামারি শুরু হওয়ার আগেই এমন টিকা প্রস্তুত থাকলে লক্ষ লক্ষ প্রাণ বাঁচানো, লকডাউন এড়ানো এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সূত্র: “A phase I, needle free, dose escalation clinical trial of pEVAC-PS, a candidate pan-Sarbecovirus Vaccine” by Alasdair PS Munro, Jonathan L. Heeney,et.al; 18th May 2026, published in Journal of Infection.
DOI: 10.1016/j.jinf.2026.106759
