আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর স্যাজিটারিয়াস এ* (Sagittarius A* বা Sgr A*)। তাকে প্রদক্ষিণ করছে S301নামক এক বিস্ময়কর নক্ষত্র । সম্প্রতি আবিষ্কৃত এই নক্ষত্রটি আকাশগঙ্গার দ্রুততম নক্ষত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এছাড়াও কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন এবং তার চারপাশের দেশ-কালের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এটির ভূমিকা মৌলিক। ফিজিক্স ওয়ার্ল্ডে ৮ই অক্টোবর ২০২৬-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নক্ষত্রটির কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রভাব পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত Sgr A*-এর ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লক্ষ গুণেরও বেশি। কৃষ্ণগহ্বরটি ঘূর্ণায়মান হওয়ায় তার চারপাশের দেশ-কালও প্রভাবিত হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় ফ্রেম ড্র্যাগিং বা লেন্স–থিরিং প্রভাব। এর ফলে কাছাকাছি থাকা নক্ষত্রের কক্ষপথে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেই কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এর আগে S2 নামের একটি নক্ষত্রকে বেশ দীর্ঘসময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তার কক্ষপথের পর্যায়কাল ১৬ বছর। কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরের নিকটতম অবস্থানেও S2 এতটা কাছে আসে না যে, তার গতিপথ বিশ্লেষণ করে সহজে কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণন নির্ণয় করা যায়। সেই তুলনায় S301 অনেক বেশি কার্যকর।
২০২৩ সালে প্রথম নক্ষত্রটির সন্ধান পান গবেষকেরা। পরবর্তী পর্যবেক্ষণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এর গতিপথে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ধরা পড়ে। ২০১৭ ও ২০২১ সালের পুরোনো তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা প্রায় এক দশক জুড়ে নক্ষত্রটির ১৯টি অবস্থান শনাক্ত করেন। তাতে স্পষ্ট হয়, S301 একটি অত্যন্ত উপবৃত্তাকার কক্ষপথে কৃষ্ণগহ্বরটিকে প্রদক্ষিণ করছে।
S301-এর কক্ষপথের পর্যায়কাল মাত্র ৮.৭ বছর, যা Sgr A*-কে প্রদক্ষিণকারী নক্ষত্রগুলির মধ্যে এখনও পর্যন্ত সর্বনিম্ন। এর কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা প্রায় ০.৯৮। কৃষ্ণগহ্বরের সবচেয়ে কাছে এলে নক্ষত্রটি তার থেকে প্রায় ১৭৮ কোটি কিলোমিটার দূরে থাকে—S2-এর তুলনায় প্রায় দশ গুণ কাছে। তখন তার গতিবেগ ঘণ্টায় নয়, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার। এই বিপুল ভরের মহাকর্ষের কারণে S301-এর কক্ষপথে শোয়ার্জশিল্ড প্রিসেশন ঘটে, যার ফলে প্রতি আবর্তনে কক্ষপথটি প্রায় দুই ডিগ্রি করে ঘুরে যায়। পাশাপাশি কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণনজনিত লেন্স–থিরিং প্রিসেশন নক্ষত্রটির কক্ষপথের সমতলকে ধীরে ধীরে দুলিয়ে দেয়।
গবেষকদের আশা, উন্নত মাধ্যাকর্ষণ বিভাজক যন্ত্র এবং প্রায় ২০৩০ সাল নাগাদ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা যুক্ত ইউরোপীয় সাদার্ন অবজারভেটরির এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপের MICADO যন্ত্রর সাহায্যে S301-এর গতি আরও নিখুঁতভাবে মাপা যাবে। তাতে আগামী এক দশকের মধ্যে Sgr A*-এর ঘূর্ণন নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে। গবেষণাটি কৃষ্ণগহ্বরের প্রকৃতি এবং চরম মহাকর্ষীয় পরিবেশে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের কার্যকারিতা বুঝতে নতুন পথ দেখাল।
সূত্র : Fastest star in the Milky Way feels the rotation of our central black hole – Physics World.
