কে. গোপালন: প্রাচীন শিলার বয়স নির্ণয়ের পথিকৃৎ

কে. গোপালন: প্রাচীন শিলার বয়স নির্ণয়ের পথিকৃৎ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ অক্টোবর, ২০২৬

পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস উন্মোচনে শিলার বয়স নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। এই গবেষণাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন ভারতীয় ভূতাত্ত্বিক কালপঞ্জিবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ কুঞ্চিতপদম গোপালন (কে. গোপালন)। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন শিলাগোষ্ঠীর বয়স নির্ধারণ এবং পৃথিবী ও চাঁদের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস অনুধাবনে তাঁর গবেষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮২ সালে তিনি শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার পান।

১৯৩৮ সালের ১২ আগস্ট তামিলনাড়ুতে জন্মগ্রহণ করেন গোপালন। ১৯৫৯ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক স্নাতক এবং ১৯৬০ সালে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে ভি. এস. ভেঙ্কটসুব্রামাণিয়নের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে ১৯৬৬ সালে পিএইচ ডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস শাখায় জর্জ ওয়েদারিলের গবেষণাগারে উল্কাপিণ্ড ও চাঁদের নমুনা নিয়ে গবেষণা করেন।

১৯৭০ সালে দেশে ফিরে তিনি টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে যোগদানের পর তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ভূতাত্ত্বিক কালনির্ণয় বা জিওক্রোনোলজি। পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল জিওফিজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (এনজিআরআই) যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণের পরও তিনি প্রতিষ্ঠানটির এমেরিটাস বিজ্ঞানী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

গোপালন রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের প্রাক্-ক্যামব্রিয়ান যুগের শিলার বয়স নির্ধারণে রুবিডিয়াম-স্ট্রনশিয়াম (Rb-Sr) পদ্ধতি ও ভর বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। দাক্ষিণাত্য মালভূমির আগ্নেয় শিলা নিয়েও তাঁর গবেষণা ভারতের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছে। উল্কাপিণ্ড ও চাঁদের নমুনা নিয়ে তাঁর প্রাথমিক কাজ সৌরজগতের কঠিন বস্তুগুলির বয়স নির্ণয় এবং চাঁদের ট্রাঙ্কুইলিটাটিস অঞ্চলে/চ্যাপটা অন্ধকার সমভূমিতে ব্যাসল্টজাত আগ্নেয় শিলার ইতিহাস অনুধাবনেও সহায়ক হয়।

গবেষণার পাশাপাশি ভারতে আধুনিক ভূতাত্ত্বিক কালনির্ণয় পরিকাঠামো গড়ে তুলতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে ভর বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র, আর্গন-আর্গন পদ্ধতিতে শিলার বয়স নির্ণয়ের সুবিধা এবং আইসোটোপ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠায় তিনি অবদান রাখেন। এনজিআরআইয়ে ভূ-কালনির্ণয় গবেষণাগার গড়ে তোলার পাশাপাশি ভুবনেশ্বরের ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্সে তেজস্ক্রিয় কার্বন-১৪ পদ্ধতিতে বয়স নির্ণয়ের জন্য ভারতের প্রথম অ্যাক্সিলারেটর মাস স্পেকট্রোমিটার স্থাপনেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

১৯৮২ সালে কৃষ্ণন পদক ও শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার ছাড়াও ১৯৯১ সালে তিনি পান এমিনেন্ট মাস স্পেকট্রোমেট্রিস্ট অ্যাওয়ার্ড। ১৯৮৬ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি, ১৯৮৮ সালে ইন্ডিয়ান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়ন এবং ১৯৯২ সালে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস, ইন্ডিয়া তাঁকে ফেলো নির্বাচিত করে। ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে স্বীকৃত গোপালন আটজন গবেষককে পিএইচ ডি অর্জনে পথনির্দেশ দিয়েছেন। মৌলিক গবেষণা, আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো নির্মাণ এবং নতুন প্রজন্মের গবেষকদের প্রশিক্ষণ—এই তিন ক্ষেত্রেই কে. গোপালনের অবদান ভারতীয় ভূবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

সূত্রঃ https://en.wikipedia.org/wiki/Kunchithapadam_Gopalan

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + one =