কোয়ান্টাম ‘সুইচে’ বদলে গেল তাপপ্রবাহের অভিমুখ 

কোয়ান্টাম ‘সুইচে’ বদলে গেল তাপপ্রবাহের অভিমুখ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ আগষ্ট, ২০২৬

তাপ সাধারণত গরম বস্তু থেকে ঠান্ডা বস্তুর দিকে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক একদল গবেষক একটি পরীক্ষায় দেখিয়েছেন, বিশেষ এক কোয়ান্টাম পদ্ধতিতে এর উল্টোটাও সম্ভব। অর্থাৎ ঠান্ডা বস্তু থেকে গরম বস্তুর দিকেও তাপ পাঠানো সম্ভব, অথচ তাতে তাপগতিবিদ্যার নিয়মও ভাঙবে না। তাঁরা এমন একটি কোয়ান্টাম ইঞ্জিন তৈরি করেছেন, যা ঠান্ডা থেকে গরমে তাপ সরানোর পাশাপাশি কাজও করতে পারে। বিষয়টি সহজ করে বোঝা যাক। ধরা যাক, পাশাপাশি দুটি ঘর, একটি গরম, অন্যটি ঠান্ডা। স্বাভাবিকভাবেই তাপ গরম ঘর থেকে ঠান্ডা ঘরে ছড়িয়ে পড়বে। এবার, সেখানে একজন কাল্পনিক ‘ডেমন’ বা আলাদিন রয়েছে। তার কাজ হল ঠান্ডা ঘরের কণাগুলিকে গরম ঘরে ঢুকতে দেওয়া, কিন্তু গরম ঘরের কণাগুলিকে ঠান্ডা ঘরে ঢুকতে বাধা দেওয়া। তাহলেই উল্টো দিকে তাপ চলাচল শুরু হবে। একে বলা হয় বিপরীতমুখী বা অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ। তবে এই আলাদিনকে সব সময় মনে রাখতে হয় কোন কণাকে ঢুকতে দেওয়া হল আর কোনটিকে আটকানো হল। অর্থাৎ তার একটি স্মৃতিভাণ্ডার দরকার। নতুন তথ্য রাখার জন্য পুরনো তথ্য মুছতে হবে। আর সেই তথ্য মুছতে গিয়েই তৈরি হয় কিছুটা এনট্রপি, অর্থাৎ শক্তি ও কণার ছড়িয়ে পড়া বা বিশৃঙ্খলা । তাই শেষ পর্যন্ত তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সঙ্গে কোনও বিরোধ তৈরি হবে না। এই ‘আলাদিনে’র কাজটি বাস্তবে করতে গবেষকরা ব্যবহার করেছেন কোয়ান্টাম সুইচ। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালির পালের্মো বিশ্ববিদ্যালয় এবং চিনের ছুফু নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পরীক্ষাটি চালান। কোয়ান্টাম জগতের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল, সেখানে শুধু কণাই যে একসঙ্গে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে- তা নয়, এমনকি ঘটনাগুলির ক্রমও অনির্দিষ্ট হতে পারে। সহজভাবে বললে, দুটি কাজের মধ্যে কোনটি আগে আর কোনটি পরে হবে, সেই নিয়মেরও নির্দিষ্টতা থাকে না। একে বলা হয় অনির্দিষ্ট কার্যকারণ ক্রম। এখানেই কাজ করে কোয়ান্টাম সুইচ। এর একটি নিয়ন্ত্রণকারী কিউবিট থাকে। কিউবিটের অবস্থার উপর নির্ভর করে দুটি প্রক্রিয়ার ক্রম বদলে যায়। আর কিউবিট যদি একই সঙ্গে ০ ও ১-এর অবস্থায় থাকে, তখন দুটি ক্রমই একসঙ্গে কার্যকর হতে পারে। এই অদ্ভুত কোয়ান্টাম অবস্থাই ঠান্ডা থেকে গরমে তাপ যাওয়ার পথ তৈরি করে। গবেষকরা ইন্টারফেরোমিটার দিয়ে ফোটনকে দুটি পথে পাঠিয়ে দুই রকম ঘটনার ক্রম তৈরি করেন। এই দুই পথের সুপারপজিশন থেকেই তৈরি হয় কোয়ান্টাম সুইচের প্রভাব। একই ব্যবস্থায় তৈরি কোয়ান্টাম ইঞ্জিন ঠান্ডা থেকে গরমে তাপ সরিয়েও কাজ উৎপন্ন করতে পারে। তবে এতে তাপগতিবিদ্যার নিয়ম ভাঙে না। কারণ প্রতিটি চক্র শেষে কিউবিটকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হয়, যার জন্য শক্তি খরচ হয় এবং এনট্রপি তৈরি হয়। ফলে মোট হিসাবে দ্বিতীয় সূত্র অক্ষুণ্ণ থাকে। এই গবেষণা দেখায়, কোয়ান্টাম জগতে তাপের প্রবাহ শুধু গরম-ঠান্ডার পার্থক্যের উপর নয়, ঘটনাগুলির ক্রম ও তথ্যের উপরও নির্ভর করতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধারণা নতুন কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র ইঞ্জিন তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।

 

Physics World Quantum Briefing 2.0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − nine =