কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ কাটাবে মনের কুয়াশা?

কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ কাটাবে মনের কুয়াশা?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ জুলাই, ২০২৬

বিষণ্ণতা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পরও অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই স্মৃতি শক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, চট করে সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা এবং চিন্তাভাবনার গতি কমে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থেকেই যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ব্রেন ফগ’ । সম্প্রতি নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি প্রচলিত ওষুধ প্রুক্যালোপ্রাইড এই জটিল সমস্যার উন্নতিতে দিশা দেখাতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম এবং ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড-এর গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে সাইকোলজিক্যাল মেডিসিন পত্রিকাতে। এই গবেষণায় অংশ নেন ৫০ জন প্রাপ্তবয়স্ক, যাঁরা অতীতে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হলেও অন্তত ছটা মাস তারা সুস্থ ছিলেন এবং তখন কোনো অবসাদরোধক ওষুধ গ্রহণ করতে শুরু করেন নি। অংশগ্রহণকারীদের অনির্দিষ্টভাবে দুই দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে প্রতিদিন ২ মিলিগ্রাম প্রুক্যালোপ্রাইড এবং অন্য দলকে একই সময়ের জন্য প্লাসিবো দেওয়া হয়। ওষুধটি মোট ৭–১০ দিন ব্যবহার করা হয়।

প্রুক্যালোপ্রাইড মূলত ৫-এইচটি৪ (5-HT4) সেরোটোনিন গ্রাহীকোষকে সক্রিয় করে, যা শুধু অন্ত্রেই নয়, মস্তিষ্কেও বিদ্যমান। এই গ্রাহীকোষ স্মৃতি, শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষকদের ধারণা, এই গ্রাহীকে সক্রিয় করার মাধ্যমে মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণ আরও কার্যকর হয় এবং বোধবুদ্ধি ক্ষমতার উন্নতি ঘটে।

ওষুধ সেবনের আগে ও পরে অংশগ্রহণকারীদের ওপর একাধিক বোধবুদ্ধির পরীক্ষা চালানো হয়। এর মধ্যে ছিল স্মৃতি যাচাইয়ের Auditory Verbal Learning Test (AVLT), কর্মস্মৃতি মূল্যায়নের N-back পরীক্ষা এবং মনোযোগ, নির্বাহী কার্যক্ষমতা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি নির্ণয়ের Trail Making Test (TMT) ও Digit Symbol Substitution Test (DSST)। পাশাপাশি আবেগ-সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা মূল্যায়নের জন্য বিশেষ মানসিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়।

দেখা যায়, যাঁরা প্রুক্যালোপ্রাইড গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা প্লাসিবো গ্রুপের তুলনায় স্মৃতি, মনোযোগ ও চিন্তার গতির পরীক্ষায় বেশ ভালো ফল করেন। তাঁরা শুধু দ্রুত উত্তরই দেননি, তাঁদের উত্তরের নির্ভুলতাও বেশি ছিল। গবেষণায় ওষুধটির কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি। গবেষকদের মতে, এটি মৃদুভাবে অন্ত্রের কার্যকলাপ বাড়ায় বলে উল্লেখযোগ্য পেটের সমস্যাও সৃষ্টি করেনি। গবেষণার প্রধান গবেষক ড. অ্যাঙ্গহারাড ডি কেটস বলেন, বিষণ্নতার ক্ষেত্রে ব্রেন ফগ প্রায়ই উপেক্ষিত একটি সমস্যা। এই গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, ৫-এইচটি৪ রিসেপ্টরকে লক্ষ্য করে তৈরি ওষুধ ভবিষ্যতে বিষণ্নতার বোধবুদ্ধি সমস্যার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। গবেষণার জ্যেষ্ঠ গবেষক অধ্যাপক সুসানা মারফির মতে, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে বিষণ্নতার মানসিক উপসর্গ কমে গেলেও স্মৃতি ও মনোযোগের সমস্যা থেকেই যায়। তাই এই ওষুধ ভবিষ্যতে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

তবে গবেষকরা বলেছেন, এটি খুবই ছোট পরিসরের একটি প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। তাই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ছাড়া প্রুক্যালোপ্রাইডকে বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহার করা যাবে না। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে, কোষ্ঠকাঠিন্যের এই পরিচিত ওষুধটি বিষণ্নতার ‘ব্রেন ফগ’ দূর করার একটি নতুন চিকিৎসা বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

সূত্র: Angharad N. de Cates, Sorcha Hamilton, Anutra Guru, Merethe Blandhol, Michael Colwell, Philip J. Cowen, Meghan Simmons, Bailey Jones, Catherine J. Harmer, Susannah E. Murphy. Pro-cognitive effects of 5-HT4 receptor agonism in individuals with remitted depression. Psychological Medicine, 2026; 56 DOI: 10.1017/S0033291726104450

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + 20 =