ক্রিয়েটিন: পেশী থেকে মস্তিষ্কে

ক্রিয়েটিন: পেশী থেকে মস্তিষ্কে

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ মে, ২০২৬

মানবদেহ লিভার, কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ে গ্লাইসিন, আর্জিনিন ও মেথিওনিন প্রভৃতি অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে ক্রিয়েটিন তৈরি করে। এরপর এটি রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শক্তি-নির্ভর টিস্যু/কোষকলায় বিশেষত পেশীতে সঞ্চিত হয়। এরপর এটি রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে পৌঁছয়, বিশেষ করে পেশীতে, যেখানে প্রায় ৯৫% ক্রিয়েটিন সঞ্চিত থাকে। কোষের ভেতরে এটি ফসফোক্রিয়েটিনে রূপান্তরিত হয়ে দ্রুত এডিনোসিন ট্রাইফসফেট বা এ টি পি পুনর্গঠনে সহায়তা করে। এই এ টি পি-ই কোষের প্রধান শক্তি একক, যা পেশী সংকোচন থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের জটিল কার্যক্রম পর্যন্ত সবকিছুকে সচল রাখে। তাই তীব্র শারীরিক পরিশ্রম বা মানসিক চাপের মুহূর্তে ক্রিয়েটিনের এই দ্রুত শক্তি সরবরাহ ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পেশী তে বেশি মাত্রায় সঞ্চিত হওয়ায় ক্রিয়েটিন এতদিন মূলত জিম ও অ্যাথলেটদের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল। কিন্তু আজ সে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন, অনেক বেশি বিস্তৃত পরিচয়ে। শুধু পেশীশক্তি বাড়ানোর উপাদান নয়, মানবদেহের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এবং সম্ভাব্য চিকিৎসাগত প্রয়োগেও এর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ক্রিয়েটিন এখন আর কেবলমাত্রই ক্রীড়াজগতের সীমাবদ্ধ সম্পদ নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক জৈব যৌগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্রিয়েটিন মনোহাইড্রেট সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে পেশীতে ক্রিয়েটিন ও ফসফোক্রিয়েটিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, ফলে স্বল্প সময়ের উচ্চ-তীব্রতার কাজ, যেমন স্প্রিন্ট, ভারোত্তোলন বা দ্রুত শক্তি প্রয়োজন এমন ব্যায়াম – এসবই উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। এবং এর প্রভাব শুধু শারীরিক সক্ষমতায় নয়, মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনাময়। গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে স্মৃতিশক্তি, মানসিক গতি এবং মেজাজ ভালো করার ক্ষেত্রেও ক্রিয়েটিনের ভূমিকা থাকতে পারে, বিশেষ করে যাদের শরীরে স্বাভাবিকভাবে এর মাত্রা কম।

এছাড়া স্নায়বিক ও মানসিক বিভিন্ন অবস্থার ক্ষেত্রেও ক্রিয়েটিনের সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে গবেষণা চলছে। পার্কিনসন্স রোগ, অবসাদ কিংবা বয়সজনিত পেশী ও হাড় ক্ষয়ের মতো সমস্যায় এটি সহায়ক হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য এইসব ক্ষেত্রে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। ডোজ প্রসঙ্গে বলা যায়, সাধারণত একটি লোডিং ফেজ (প্রতিদিন ২০ গ্রাম, ৫–৭ দিন) এবং পরবর্তী মেইনটেন্যান্স ফেজ (৩–৫ গ্রাম প্রতিদিন) অনুসরণ করা হয়। তবে শরীরের একটি নির্দিষ্ট সঞ্চয়সীমা রয়েছে; অতিরিক্ত ক্রিয়েটিন ক্রিয়েটিনিন হিসেবে নির্গত হয়। ফলে বেশি গ্রহণ মানেই বেশি উপকার, বিজ্ঞান এ ধারণাকে সমর্থন করে না। ক্রিয়েটিন একটি সম্ভাবনাময় জৈব যৌগ, যা সঠিক ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পুষ্টি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে এখনই একে সর্বরোগহর ভাবার কোনো কারণ নেই।

 

সূত্র: Mehdi Boroujerdi. Handbook of Creatine and Creatinine In Vivo Kinetics: Production, Distribution, Metabolism, and Excretion. CRC Press, 11 May 2026 DOI: 10.1201/9781003604662

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + ten =