আজ থেকে প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে উত্তর আমেরিকায় বিচরণ করত পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর শিকারি লম্বা বাঁকা খড়গের মতো দাঁতওয়ালা বিড়াল স্মিলোডন ফেটালিস। উট থেকে শুরু করে বিশালাকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে প্রায় ৭ ইঞ্চি লম্বা ছুরির ফলার মতো ধারালো শ্বদন্ত দিয়ে শিকারকে মুহূর্তেই কাবু করত তারা। কিন্তু যে অস্ত্র তাদের এত শক্তিশালী শিকারিতে পরিণত করেছিল, সেটিই হয়তো শেষ পর্যন্ত তাদের বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল , এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা। গবেষণাটির বিবরণ প্রকাশিত হয় জার্নাল অফ ভার্টিব্রেট প্যালিয়েন্টোলজিতে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নারিমান শাতার আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে সংরক্ষিত অ্যারিজোনা থেকে পাওয়া একটি পুরোনো প্রাণীর খুলির পুনঃবিশ্লেষণ করেন। খুলিটি আগে শুধু ফেলাইন বা বিড়ালজাতীয় প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত ছিল। কিন্তু এর চ্যাপ্টা, পাশ থেকে চাপা ধারালো শ্বদন্ত দেখে গবেষকের সন্দেহ হয়। পরে ত্রিমাত্রিক পুনর্গঠন করে তিনি দেখান, এটি আসলে Adelphailurus kansensis, প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে উত্তর-পশ্চিম আমেরিকায় বসবাসকারী পুমা-আকারের এক প্রাচীন ধারালো বাঁকা দাঁতওয়ালা বিড়াল।
এই প্রাণীটির দাঁত ছিল মাত্র প্রায় ১ ইঞ্চি লম্বা, যা স্মিলডোনের বিশাল দাঁতের তুলনায় অনেক ছোট। তবুও এগুলো ছিল ধারালো এবং মাংস সহজে কেটে ফেলতে সক্ষম। গবেষণায় আরও দেখা যায়, এই বাঁকা দাঁতওয়ালা বিড়ালদের প্রথমদিকের পূর্বপুরুষদের দাঁত তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল। বিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে সেই দাঁত আরও দীর্ঘ ও বিশেষীভূত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত স্মিলোডন ফেটালিসের বিশাল শ্বদন্তে পরিণত হয়।
তবে এই বিশেষায়নের একটা বিশেষত্ব আছে। আধুনিক সিংহ বা বাঘের গোলাকার শক্ত দাঁতের তুলনায় এই বাঁকা খড়্গ আকৃতির দাঁত ছিল অনেক বেশি ভঙ্গুর। এগুলো বড় শিকারের ঘাড় বা শরীরে গভীর আঘাত করার জন্য উপযোগী হলেও সহজেই ভেঙে যেতে পারত। ফলে এই শিকারিরা নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের বড় প্রাণীর ওপরই অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
গবেষকরা বলেছেন, এটি ছিল এক ধরনের “ম্যাক্রোইভোলিউশনারি র্যাচেট”। এটি বিবর্তনের এমন এক পথ, যেখানে একটি বিশেষ দক্ষতা ক্রমাগত বাড়তে বাড়তে অন্য অভিযোজনের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। হিমযুগের একেবারে শেষ দিকে, প্রায় ১৩ হাজার বছর আগে যখন উট, গ্রাউন্ড স্লথসহ বড় বড় শিকারি প্রাণী বিলুপ্ত হতে শুরু করে, তখন স্মিলোডন নতুন শিকার ধরা বা পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেনি। এর ফলেই প্রায় ১০ হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় এই কিংবদন্তি শিকারি।
এই গবেষণার হাত ধরে আমরা যেটা খুব স্পষ্টভাবে শিখলাম সেটা হল, প্রকৃতিতে শুধু শক্তিশালী হওয়াই যথেষ্ট নয়; পরিবেশভেদে টিকে থাকার জন্য অভিযোজনক্ষমতাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কখনও কখনও যে বৈশিষ্ট্য একটি প্রাণীকে নির্দিষ্ট একটি পরিবেশে টিকে থাকার জন্য সাফল্য দেয়, পরিবেশ বদলে গেলে সেই একই বৈশিষ্ট্য তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
