গঞ্জিকা সেবন ও অলীক ধারণা গঠন 

গঞ্জিকা সেবন ও অলীক ধারণা গঠন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ জুলাই, ২০২৬

গাঁজা বা ক্যানাবিস আজকাল কোথাও কোথাও চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে নতুন গবেষণাগুলি একটি বিষয়ে সতর্ক করছে। গাঁজার প্রধান সক্রিয় উপাদান টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC)। এটি মানুষের স্মৃতিকে এমনভাবে প্রভাবিত করে, ফলে বাস্তবে না-ঘটা ঘটনাও সত্যি বলে মনে হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, THC শুধু স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে না, বরং ‘ফলস মেমরি’ বা মিছে স্মৃতি তৈরির ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি এমন কিছু ঘটেছে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করে, যা বাস্তবে আদপেই ঘটেনি। আবার সত্য কোনো ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিকৃতও হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি পরীক্ষা করতে গবেষকেরা একটি সুপরিচিত মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। যার নাম ডিস-রোডিগার-ম্যাকডারমট (DRM) পদ্ধতি। অংশগ্রহণকারীদের একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি শব্দ শোনানো হয়। পরে তাঁদের জিজ্ঞাসা করা হয়, কোন কোন শব্দ তাঁরা আগে শুনেছেন। দেখা যায়, THC- প্রভাবিত ব্যক্তিরা এমন অনেক শব্দকেও আগে শোনা বলে দাবি করেন, যা তাঁরা আসলে কখনও শোনেননি। অর্থাৎ, তাঁদের মধ্যে ভুল স্মৃতি তৈরির প্রবণতা স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর মূল কারণ হল, মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের উপর THC-এর প্রভাব। প্রথমটি হিপোক্যাম্পাস, যা নতুন স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয়টি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যা তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কোন স্মৃতি বাস্তব, আর কোনটি কল্পনা, তা যাচাই করতে সাহায্য করে। THC এই অংশগুলির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করলে স্মৃতি সঠিকভাবে সংরক্ষিত বা পুনরুদ্ধার হয় না। এ ছাড়া গবেষণায় আরও দেখা গেছে, THC-এর প্রভাবে মস্তিষ্কের সোর্স মনিটরিং বা তথ্যের উৎস শনাক্ত করার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে মানুষ বুঝতে পারে না, কোনো ঘটনা সে সত্যিই দেখেছে বা শুনেছে, নাকি কেবল কল্পনা করেছে বা অন্যের কাছ থেকে জেনেছে, তা গুলিয়ে যায়। একই সঙ্গে ঘটনাকে ঘিরে থাকা সময়, স্থান বা পরিস্থিতির মতো প্রাসঙ্গিক তথ্যও বিকৃত হয়ে যায়। ফলে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং কল্পনার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া THC-এর মাত্র একটি ডোজ নেওয়ার পরেও অ্যাসোসিয়েটিভ মেমরি পরীক্ষায় ভুল শনাক্তকরণের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, এমন প্রমাণও আছে। আবার প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের মতো পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণকারীরা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রভাবে সহজেই ভুল বিবরণকে সত্যি বলে মেনে নেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় তাঁরা নিজেদের ভুল তথ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী থাকেন। এই প্রভাব অবশ্য নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবুও কিছু গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত গাঁজা টানলে নেশা কেটে যাওয়ার পরও এই ঝুঁকি কিছুটা থেকে যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। এই ফলাফল শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য নয়, আইন ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী যদি THC-এর প্রভাবে থাকে, তাহলে তার সাক্ষ্যে ভুল তথ্য থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। অথচ সেই ব্যক্তি সেই ভুল তথ্যকেই সম্পূর্ণ সত্য বলে বিশ্বাস করতে পারেন। ফলে তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র: Kloft, L., et al. “Cannabis increases susceptibility to false memory.” Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 2 =