গর্ভস্থ শিশুর অস্ত্রোপচার 

গর্ভস্থ শিশুর অস্ত্রোপচার 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ জুন, ২০২৬

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু ঘটনা ‘অসম্ভবকে সম্ভব’ করার উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। তেমনই এক বিরল ও বিস্ময়কর অস্ত্রোপচারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাইজেরিয়ার শিশু শল্যচিকিৎসক ড. ওলুইয়িঙ্কা ওলুটয়-এর নাম। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি জটিল অস্ত্রোপচার অনাগত এক শিশুর প্রাণ বাঁচিয়েছে, যখন সে মায়ের গর্ভে বেড়ে উঠছিল। ঘটনার শুরু গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ে। পরীক্ষায় ধরা পড়ে, ভ্রূণের মেরুদণ্ডের নীচের অংশ বা লেজের হাড়ের কাছে একটি বড় টিউমার তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের টিউমার দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করতে পারে। শিশুটির ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটছিল। টিউমারটি ক্রমশ বড় হয়ে উঠছিল এবং তার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ল। তখন গর্ভাবস্থার মাত্র ২৩ সপ্তাহ চলছে। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা শিশুর জন্মের পর অস্ত্রোপচারের কথা ভাবেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে টিউমারটি এত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল যে জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করলে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব নাও হতে পারত। ফলে চিকিৎসকদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। ড. ওলুটয়ে এবং তাঁর সহকর্মীরা গর্ভাবস্থার মধ্যেই অস্ত্রোপচার করার পরিকল্পনা করলেন। এটি অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এক প্রক্রিয়া। অস্ত্রোপচারের সময় প্রথমে মায়ের জরায়ু সতর্কতার সঙ্গে খোলা হয়। এরপর ক্ষুদ্র ভ্রূণটিকে সাময়িকভাবে জরায়ুর বাইরে আনা হয়, কিন্তু তার সঙ্গে গর্ভনাড়ীর সংযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। এই সংযোগের মাধ্যমেই শিশুটি অক্সিজেন ও পুষ্টি পেতে থাকে। সে সময় শিশুটি ছিল অত্যন্ত ছোট ও স্পর্শকাতর। ফলে অস্ত্রোপচারের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। চিকিৎসকেরা সূক্ষ্ম দক্ষতার সঙ্গে টিউমারটি অপসারণ করেন। একই সঙ্গে নিশ্চিত করেন, যাতে মা ও শিশু উভয়ের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। সফলভাবে টিউমার অপসারণের পর শিশুটিকে আবার মায়ের জরায়ুর ভেতরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর জরায়ু বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে গর্ভাবস্থা স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। এই পদক্ষেপ শিশুটিকে আরও কয়েক মাস মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেয়। অস্ত্রোপচারের পরবর্তী সময়ে গর্ভাবস্থা সফলভাবে এগোতে থাকে। কয়েক মাস পরে নির্ধারিত সময়ে শিশুটির জন্ম হয়। সে ছিল সুস্থ ও সবল। চিকিৎসকদের কাছে এ এক অসাধারণ সাফল্য, কারণ এত জটিল ভ্রূণ-অস্ত্রোপচারের পর এমন ফলাফল খুবই বিরল। এই অস্ত্রোপচারকে বিশেষ করে তুলেছে আরেকটি বিষয়। এখানে চিকিৎসকদের একসঙ্গে দুজন রোগীর চিকিৎসা করতে হয়েছে – মা এবং তার অনাগত সন্তান। অস্ত্রোপচারের প্রতিটি ধাপে ছিল সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বিত প্রচেষ্টা। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সাফল্য আধুনিক ভ্রূণ-চিকিৎসার সম্ভাবনাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। একসময় যেসব পরিস্থিতিকে প্রায় অনিবার্য মৃত্যুঝুঁকি হিসেবে দেখা হতো, এখন বিশেষায়িত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেগুলির কিছু ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ড. ওলুটয়ের এই কাজ বিশ্বজুড়ে বহু চিকিৎসক ও পরিবারকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর দক্ষতা, সাহস এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমা প্রসারণের প্রচেষ্টা এক অনাগত শিশুকে সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এই ঘটনা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত ।

 

সূত্র: Engineering & Science ; June ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + two =