আমরা সাধারণত মনে করি, গাছপালা নিষ্ক্রিয় জীব। তারা শুধু সূর্যের আলো, জল আর মাটির পুষ্টির ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। কিন্তু তারা কি পারিপার্শ্বিক শব্দও অনুভব করতে পারে? এই নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে বেশ কৌতূহল ছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, গাছের বীজ বৃষ্টি পড়ার আগেই বৃষ্টির শব্দ বা কম্পন অনুভব করতে পারে এবং সেই সংকেত পেয়ে দ্রুত অঙ্কুরোদ্গমের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্টিফিক রিপোর্ট জার্নালে। গবেষকরা বিশেষভাবে ধানের বীজ নিয়ে পরীক্ষা চালান। কিছু বীজকে এমন পরিবেশে রাখা হয়, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ ও তার সৃষ্ট কম্পন কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এবং বাকি বীজ রাখা হয় সম্পূর্ণ শব্দহীন পরিবেশে। দেখা গেল, যেসব বীজ বৃষ্টির শব্দ-কম্পনের সংস্পর্শে ছিল, সেগুলো নিরিবিলি পরিবেশে রাখা বীজের তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দ্রুত অঙ্কুরিত হয়। অর্থাৎ, বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে এসে পৌঁছানোর আগেই বীজ বুঝে যায়, সৃষ্টির সময় এসে গেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটাই প্রথম স্পষ্ট হাতেনাতে প্রমাণ যে উদ্ভিদ সরাসরি পরিবেশের শব্দ সংকেতে সাড়া দিতে পারে। অর্থাৎ, গাছ শুধু আলো বা আর্দ্রতার পরিবর্তন নয়, শব্দের কম্পনও বুঝতে সক্ষম।
এছাড়াও এই গবেষণায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যখন বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে বা জলে পড়ে, তখন তা শক্তিশালী কম্পন তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গ মাটি ও জলের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভিদের কোষের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র কাঠামো, যাকে স্ট্যাটোলিথ বলা হয়, সেটি সম্ভবত এই কম্পন অনুভব করতে পারে। স্ট্যাটোলিথ সাধারণত গাছকে মাধ্যাকর্ষণ, দিকনির্দেশ এবং অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। এখন ধারণা করা হচ্ছে, এটি শব্দের কম্পনও শনাক্ত করতে পারে।
এই ক্ষমতা উদ্ভিদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি বীজ দ্রুত অঙ্কুরিত হতে পারে, তবেই দ্রুত শিকড় গজাবে এবং মাটিতে নিজেদের শক্ত করে গাঁথতে পারবে। আবহাওয়া আবার শুষ্ক হয়ে যাওয়ার আগে এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়। গবেষক দলের সদস্যরা মনে করছেন, শুধু ধান নয়, অন্যান্য অনেক উদ্ভিদও পরিবেশের শব্দে সাড়া দিতে পারে। ভবিষ্যতে তাঁরা পরীক্ষা করবেন, বাতাসের শব্দ, ঝড়ের কম্পন, এমনকি আশপাশের অন্যান্য প্রাকৃতিক শব্দও উদ্ভিদের আচরণে প্রভাব ফেলে কি না।
এই আবিষ্কার কৃষিক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে। যদি নির্দিষ্ট শব্দ বা কম্পনের মাধ্যমে বীজের অঙ্কুরোদ্গম দ্রুত করা যায়, তবে কম জল বা চরম থেকে চরমতর শুষ্ক আবহাওয়া থাকলেও তার মধ্যেই ফসল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।
গাছপালা নীরব হলেও তারা নিস্তব্ধ নয়। তারা হয়তো আমাদের চেতনার চেয়েও অনেক অনেক বেশি সচেতন, সংবেদনশীল এবং প্রকৃতির সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ও ভাষা বুঝতে সক্ষম। আমরা শুনতে না পেলেও, গাছপালা ঠিকই শুনতে পায় বৃষ্টির পদধ্বনি এবং আঁচ করে ফেলে নিজের বিকশিত হওয়ার সময় এসে গেছে।
সূত্র: Scientific American (May Issue), “Plants can ‘hear’ rain coming, spurring them into action,” April 22nd , 2026.published in scientific reports.
