রাসায়নকে পরিবেশবান্ধব করার প্রচেষ্টা প্রায় তিন দশকের পুরোনো। কিন্তু বাস্তবে গবেষণাগারে ব্যবহৃত দ্রাবকগুলির ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের ছাপ খুবই সামান্য। বরং গত ৪০ বছরে রাসায়নিক পেটেন্টে ব্যবহৃত বিপজ্জনক দ্রাবকের হার কমার বদলে বেড়েছে। Angewandte Chemie–তে প্রকাশিত এক বৃহৎ সমীক্ষায় ১৯৭৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পেটেন্টে নথিভুক্ত প্রায় ১৩ লক্ষ রাসায়নিক বিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এমনই চিত্র উঠে এসেছে।
দ্রাবক হল রাসায়নিক বিক্রিয়ার অন্যতম প্রধান সহায়ক তরল। বিভিন্ন রাসায়নিককে দ্রবীভূত করা, বিক্রিয়ার পর উৎপাদিত পদার্থ আলাদা করা এবং বিশুদ্ধ করার কাজে এগুলি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বহুল ব্যবহৃত দ্রাবকসমূহের অনেকগুলিই স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যেমন ডাইক্লোরোমিথেন (DCM)। আবার অনেক দ্রাবক অত্যন্ত দাহ্য। অধিকাংশ দ্রাবকই তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপন্ন হওয়ায় এগুলির কার্বন-ঘটিত পরিবেশগত প্রভাবও যথেষ্ট।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের হেলেন স্নেডন এবং সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, লোজানের গবেষক মার্টেন ডোবেলেয়ার এই বিষয়ে পেটেন্ট-তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে পেটেন্টে উল্লেখিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশে বিপজ্জনক দ্রাবক ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০১৬ সালে সেই হার ৭০ শতাংশ ছাড়ায়। অর্থাৎ গ্রিন কেমিস্ট্রির দীর্ঘ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিপজ্জনক দ্রাবকের ওপর নির্ভরতা কমেনি।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। কোনও বিষাক্ত দ্রাবকের ব্যবহার সরকারি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সীমিত করা হলে রসায়নবিদেরা অনেক সময় নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প বেছে নেওয়ার বদলে অন্য একটি বিপজ্জনক দ্রাবকে চলে যান। পাশাপাশি ট্রাইফ্লুরোঅ্যাসিটিক অ্যাসিড (TFA)-এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনপ্রিয় পেপটাইড ওষুধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ এই রাসায়নিককে কিছু সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ চিরস্থায়ী রাসায়নিক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি PFAS-গোষ্ঠীর চিরস্থায়ী রাসায়নিকের সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষকদের মতে, এর একটি কারণ হল, ওষুধ আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণার ধরন। দ্রুত বিপুল সংখ্যক নতুন অণু তৈরি করতে গিয়ে গবেষকেরা পূর্ব ব্যবহৃত পরীক্ষিত পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ফলে নিরাপদ দ্রাবক বেছে নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনা কম।
তবে সমীক্ষাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তথ্যভান্ডারটি ২০১৬ সালেই শেষ, ফলে পরবর্তী এক দশকের পরিবর্তন এতে ধরা পড়েনি। আবার কত পরিমাণ দ্রাবক ব্যবহৃত হয়েছে, তাও সমীক্ষায় বিবেচিত হয়নি। ছোট আকারের বা ক্ষুদ্রায়িত পরীক্ষায় দ্রাবকের মোট ব্যবহার কমে থাকতে পারে। তাছাড়া শিল্পোৎপাদনের পর্যায়ে অনেক বিপজ্জনক দ্রাবক বাদ দেওয়া হয়। সত্যি কথা বলতে গেলে, পরীক্ষাগার পর্যায়ে রাসায়নবিদ্যার পরিবেশবান্ধব রূপান্তর এখনও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-03023-0
