চাঁদ-সূর্যের টানে ধীর ভূকম্প ? 

চাঁদ-সূর্যের টানে ধীর ভূকম্প ? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ অক্টোবর, ২০২৬

চাঁদ আর সূর্যের টানে শুধু তো জোয়ার-ভাটা নয়, ওই একই মহাকর্ষের টান পৌঁছে যায় পৃথিবীর শক্ত মাটিতেও। ভূত্বক কখনও সামান্য ফুলে ওঠে, কখনও আবার চাপে সঙ্কুচিত হয়। চাপটা এতই কম, মাত্র কয়েক কিলোপাস্কাল, যে আমাদের হাতে হালকা চাপ দেওয়ার মতোই। কিন্তু মাটির কয়েক কিলোমিটার নীচে কোনও ফল্ট যদি এমনিতেই ধারে কাছে থাকে, এই সামান্য ধাক্কাই তাকে নড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তবে এভাবেই শুরু হতে পারে ‘ধীর ভূমিকম্প’। সাধারণ ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রচুর শক্তি ছেড়ে দেয়। কিন্তু ধীর ভূমিকম্প থেকে একেবারে অন্যরকম শক্তি বেরোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনও কয়েক দিন ধরে। এতই ধীরে যে ভূপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ সাধারণত কিছুই টের পায় না। জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার ক্যাসকাডিয়া অঞ্চলের মতো এলাকায় এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটে। আর এখানেই গল্পটা আরও কৌতূহলজনক হয়ে ওঠে। এইসব ভূমিকম্পর অনেকগুলিই যেন জোয়ার-ভাটার ঘড়ি মেনে চলে, কখনও ১২ ঘণ্টা, কখনও ২৪ ঘণ্টার ছন্দে। প্রশ্ন ছিল, চাঁদ-সূর্যের এত সামান্য টান কীভাবে মাটির গভীরে থাকা বিশাল ফল্টকে নাড়াতে পারে? নতুন কম্পিউটার মডেলিং সেই রহস্যের দিকে আঙুল তুলেছে – রেজোন্যান্স বা অনুরণন। ভাবা যাক, মাটির নীচের ফল্টটা একটা বিশাল স্প্রিং। তারও একটা নিজস্ব ‘ছন্দ’ আছে। চাপ বদলালে কত দ্রুত তার ঘর্ষণ ও নড়াচড়ার ধরন বদলাবে, তার একটা সময় লাগে। চাঁদ-সূর্যের টানের ছন্দ যদি কোনওভাবে সেই সময়ের সঙ্গে মিলে যায়, তখন খেলা বদলে যেতে পারে। ঠিক যেমন দোলনাকে ঠিক সময়ে বারবার ধাক্কা দিলে অল্প শক্তিতেই দোল অনেক বড় হয়ে ওঠে। তেমনই, চাঁদ-সূর্যের ক্ষীণ টানও সঠিক সময়ে পড়লে ফল্টের নড়াচড়া বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। নতুন মডেলটি বাস্তবে দেখা ধীর ভূকম্পের সঙ্গে জোয়ার-ভাটার এই তালমিলও ব্যাখ্যা করতে পারছে। এমনকি ভবিষ্যতে এই ছন্দ দেখে মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা ফল্টের কিছু বৈশিষ্ট্য আন্দাজ করাও সম্ভব হতে পারে। তবে এর আসল গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ধীর ভূমিকম্প মাটির নিচের চাপকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেয়। অর্থাৎ, তারা হয়তো বড় ভূমিকম্পের আগের ভূগর্ভস্থ ‘চাপের হিসাব’-এর একটা অংশ বদলে দিচ্ছে। পৃথিবীর মাটির নীচে তাই সবসময় যে বড় কোনও বিস্ফোরণ ঘটতে হবে এমন নয়। কখনও কখনও চাঁদ-সূর্যের একটুখানি টান, আর সঠিক সময়- এই দুটোই যথেষ্ট।

 

সূত্র: Zhou, Y., et al. (2026). Theoretical constraints on tidal triggering of slow earthquakes. Journal of Geophysical Research: Solid Earth. DOI: 10.1029/2026JB033983

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × five =