চা না কফি?

চা না কফি?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ মে, ২০২৬

আমরা প্রত্যেকেই কম বেশি চা বা কফি খেয়েই থাকি, কিন্তু এবার জানা যাক আমাদের হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য দৈনন্দিন চা বা কফি পান কতোটা উপকারী বা অপকারী। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, চা ও কফি হাড়ের ঘনত্বের ওপর ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। প্রায় ১০ বছর ধরে চলা এই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০ হাজার বয়স্ক নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণাটি বিশেষভাবে মেনোপজ/রজোনিবৃত্তি পরবর্তী নারীদের ওপর করা হয়, কারণ এই সময়ে শরীরে দ্রুত হাড় ক্ষয় হতে শুরু করে এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আর অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যেখানে হাড় ধীরে ধীরে দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এতে সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যেতে পারে, বিশেষ করে কোমর, মেরুদণ্ড ও কবজির হাড়। বিশ্বজুড়ে ৫০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন এই সমস্যায় আক্রান্ত হন। বয়স্কদের ক্ষেত্রে হিপ ফ্র্যাকচার খুবই বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এতে দীর্ঘদিন চলাফেরা সীমিত হয়ে যায় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে।

গবেষকরা “স্টাডি অব অস্টিওপোরোটিক ফ্র্যাকচারস” নামের এক দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের তথ্য ব্যবহার করেন। অংশগ্রহণকারীদের নিয়মিত চা ও কফি পানের অভ্যাস এবং তাদের হাড়ের আকরিক ঘনত্ব বা Bone Mineral Density (BMD) পরীক্ষা করা হয়। হাড়ের ঘনত্ব মাপতে ব্যবহার করা হয় DXA স্ক্যান, যা অস্টিওপোরোসিস নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিগুলোর একটি।

গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত চা পান করতেন, তাদের কোমরের হাড়ের ঘনত্ব যারা চা পান করেন না তাদের তুলনায় সামান্য বেশি। এই উন্নতি খুব বড় নয়, কিন্তু গবেষকদের মতে, পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন অল্প উন্নতিও ভবিষ্যতে ভাঙা হাড়ের সংখ্যা কমাতে সাহায্য করতে পারে। গবেষক এনউ লিউ বলেন, অল্প পরিমাণে হলেও হাড়ের ঘনত্ব বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে কফির ফলাফল ছিল কিছুটা জটিল। দিনে দুই থেকে তিন কাপ কফি পান করলে হাড়ের ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর প্রভাব দেখা যায়নি। তবে যারা দিনে পাঁচ কাপের বেশি কফি পান করতেন, তাদের হাড়ের ঘনত্ব কিছুটা কম পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কফিতে থাকা ক্যাফিন শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দিতে পারে এবং হাড়ের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এই প্রভাব তুলনামূলকভাবে ছোট, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে দুধ মিশিয়ে কফি পান করলে কিছুটা ক্ষতি কমতে পারে বলেও গবেষকেরা জানান।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব নারী দীর্ঘদিন ধরে বেশি অ্যালকোহল পান করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কফি হাড়ের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে। আবার স্থূলতায় ভোগা নারীদের মধ্যে চায়ের ইতিবাচক প্রভাব বেশি দেখা গেছে।

তবে গবেষকেরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই ফলাফল দেখে কফি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমিত কফি পান নিরাপদ বলেই মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু চা বা কফি নয়, হাড় ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। চা বা কফির প্রভাব তো নিমিত্ত মাত্র।

 

সূত্র: “Longitudinal Association of Coffee and Tea Consumption with Bone Mineral Density in Older Women: A 10-Year Repeated-Measures Analysis in the Study of Osteoporotic Fractures” by Ryan Yan Liu and Enwu Liu, 22 November 2025, Nutrients.

DOI: 10.3390/nu17233660

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − sixteen =