ছিল প্লাস্টিক, হল ন্যানো হিরে

ছিল প্লাস্টিক, হল ন্যানো হিরে

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

সম্প্রতি জার্মানির হেলমহোলৎজ-জেন্ট্রাম ড্রেসডেন-রসেনডর্ফ (HZDR) এবং রস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এক চমকপ্রদ সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁরা শক্তিশালী লেজারের সাহায্যে সাধারণ প্লাস্টিককে অত্যন্ত উচ্চচাপ ও তাপমাত্রায় রেখে কোটি কোটি অতি ক্ষুদ্র হিরে/ ন্যানোডায়মন্ড তৈরি করে সেগুলিকে অক্ষত অবস্থায় সংগ্রহ করেছেন। এই গবেষণাটি ভবিষ্যতে চিকিৎসা, উন্নত উপাদান ও শক্তি প্রযুক্তিতে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

গবেষণাটির সূত্রপাত হয়েছিল নেপচুন ও ইউরেনাস প্রভৃতি দূরবর্তী গ্রহের অভ্যন্তরের চরম পরিবেশ অনুকরণ করার প্রচেষ্টা থেকে। এই গ্রহগুলির গভীরে তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে এবং চাপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় চাপের তুলনায় কয়েক মিলিয়ন গুণ বেশি হতে পারে। গবেষকেরা প্লাস্টিকের ওপর শক্তিশালী লেজারের আঘাত হেনে এমনই পরিস্থিতি তৈরি করেন। তাতে প্লাস্টিকের কার্বন পরমাণুগুলি থেকে দ্রুত হিরে গঠিত হয়। তবে প্রাথমিকভাবে চরম চাপ ও তাপমাত্রা বজায় থাকা অবস্থায়ই কেবল এই স্ফটিকগুলির অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয় মাত্র ১০০ মাইক্রোমিটার পুরু PET প্লাস্টিকের পাত। লেজারের প্রতিটি স্পন্দন প্লাস্টিকের মধ্যে প্রবল অভিঘাত-তরঙ্গ সৃষ্টি করে। তাতেই তৈরি হয় ন্যানোডায়মন্ড। যা প্রতি সেকেন্ডে ১০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ছিটকে বেরিয়ে আসে। এই গতি উল্কাপিণ্ডের আঘাতের গতির সঙ্গে তুলনীয়। ফলে সংগ্রহের পাত্রে আঘাত লেগে ক্ষুদ্র হিরেগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

সমস্যা সমাধানে গবেষকেরা শূন্যস্থানেও কার্যকর, জলে দ্রবণীয় একটি আয়নীয় জেল ব্যবহার করেন। জেলটি দ্রুতগতিতে ছুটে আসা কণাগুলিকে নরমভাবে আটকে রাখে। পরে সেগুলিকে জেল থেকে আলাদা করে বিশুদ্ধ করা হয়। প্রতি লেজার-স্পন্দনে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ন্যানোডায়মন্ড তৈরি হলেও কয়েকশো মাইক্রোগ্রাম উপাদান সংগ্রহ করতে প্রায় ১০০টি স্পন্দনের প্রয়োজন হয়।

সংগৃহীত হিরেগুলির গড় ব্যাস মাত্র তিন ন্যানোমিটার, অর্থাৎ এক মিটারের ৩০০ কোটির এক ভাগ। প্রতিটিতে আনুমানিক ৩,০০০টি কার্বন পরমাণু রয়েছে। রস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে গবেষকেরা প্রথম এগুলিকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন।

ন্যানোডায়মন্ড অত্যন্ত কঠিন, স্থিতিশীল ও তাপসহ। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় লেজার প্রযুক্তিতে ক্ষুদ্রতর, বিশুদ্ধ এবং প্রায় একই আকারের কণা তৈরি করা সম্ভব। এগুলি অত্যন্ত সংবেদনশীল কোয়ান্টাম সেন্সর, চিকিৎসার ইমেজিং বা দেহের অভ্যন্তরীণ গঠন স্পষ্টভাবে দেখানোর উপাদান এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজে লাগতে পারে। নির্দিষ্ট মৌল যোগ করার ফলে ন্যানোডায়মন্ডের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে পারে। এমন উপাদান ভবিষ্যতে MRI পরীক্ষার কনট্রাস্ট এজেন্ট উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। ক্ষুদ্র কণার মোট পৃষ্ঠতল বেশি হওয়ায় সূর্যালোক ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড ভাঙার মতো রাসায়নিক প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর হতে পারে।

গবেষকেরা ভবিষ্যতে উৎপাদনের পরিমাণ মিলিগ্রাম স্তরে নিয়ে যেতে চান। পাশাপাশি, আরও উচ্চচাপ প্রয়োগ করে কার্বনের BC8 নামের একটি সম্ভাব্য রূপ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি হিরের চেয়ে ঘন, প্রায় সমান কঠিন এবং তুলনামূলকভাবে কম ভঙ্গুর হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ, সাধারণ প্লাস্টিককে মূল্যবান ন্যানোউপাদানে রূপান্তরের এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে উন্নত ও সম্ভাব্য আরও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপদ্ধতির পথ দেখাতে পারে।

 

সূত্র: “Recovery of ultrasmall nanodiamonds from plastics shock-compressed to pressures around 100 GPa” by B. Heuser, P. Böhringer, 25 August 2026, published in Diamond and Related Materials.

DOI: 10.1016/j.diamond.2026.114091

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + four =