অস্ট্রেলিয়ার শুষ্ক অঞ্চলে গ্রীষ্মের দুপুরে পাখির বাসার তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। সেই কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এক অভিনব কৌশল ব্যবহার করে জেব্রা ফিঞ্চ পাখি। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমের ভেতরে ছানাদের জন্মের আগেই আসন্ন গরমের সতর্কবার্তা পাঠায় তাদের বাবা-মা।
তাপমাত্রা বেড়ে গেলে প্রাপ্তবয়স্ক জেব্রা ফিঞ্চ বিশেষ ধরনের দ্রুত ও তীক্ষ্ণ স্বরের ডাক দেয়। বিজ্ঞানীরা এই ডাককে “হিট কল” বা তাপ- সতর্কবার্তা বলে থাকেন। সাধারণত ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোনোর কয়েক দিন আগে এই ডাক সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। আগের গবেষণায় জানা গিয়েছিল, ডিমের ভেতরে ভ্রূণ যদি এই ডাক শুনতে পায়, তাহলে বড় হয়ে তারা গরম সহ্য করার ক্ষমতা বেশি অর্জন করে। এমনকি তাদের বৃদ্ধি ও আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়। তবে এই ডাক সরাসরি ভ্রূণের মস্তিষ্কে কোনও প্রভাব ফেলে কি না, তা এতদিন জানা ছিল না। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা ডিম ফুটে বেরোনোর আগের কয়েক দিন ধরে ভ্রূণদের কাছে রেকর্ড করা তাপ- সতর্কবার্তা শোনান। একটি দলের ডিমে তাপ- সতর্কবার্তার সঙ্গে সাধারণ যোগাযোগের ডাকও বাজানো হয়। অন্য একটি নিয়ন্ত্রণ গোষ্ঠী শুধুই সাধারণ ডাক শোনে। ভ্রূণরা ঠিক কীভাবে এই সংকেত গ্রহণ করে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষকদের ধারণা, তারা শব্দ শোনার পাশাপাশি কম্পনও অনুভব করতে পারে। ডিম ফোটার ঠিক আগে গবেষকেরা ভ্রূণের মস্তিষ্কের একটি অংশ, হাইপোথ্যালামাস, পরীক্ষা করেন। এই অংশ শরীরের তাপমাত্রা, বৃদ্ধি এবং চাপের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রথমে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন, তাপ- সতর্কবার্তার প্রভাবে হরমোন-সংক্রান্ত জিনগুলিতে পরিবর্তন দেখা যাবে। কিন্তু ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাপ- সতর্কবার্তা শোনা ভ্রূণদের মধ্যে ৪৯টি জিনের কার্যকলাপে পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে ৪৮টির কার্যকলাপ কমে গিয়েছে। এই জিনগুলির বেশিরভাগই হরমোন নয়, বরং রক্তনালীর সংকোচন-প্রসারণ এবং কোষের গঠন নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে মস্তিষ্কের রক্তনালি ও রক্ত-মস্তিষ্ক বেড়া (ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কোষগুলিতে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এসব জিনের কার্যকলাপ কমে যাওয়ায় রক্তনালিগুলি আরও নমনীয় অবস্থায় থাকতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে তীব্র গরমে রক্তপ্রবাহের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজ হয়। দেখা গেছে, TPM1 নামে একটি জিনের কার্যকলাপ বিশেষভাবে কমে যায় , যা নমনীয় রক্তনালির সঙ্গে সম্পর্কিত।
পরীক্ষার সময় ডিমগুলিকে সবসময় একই তাপমাত্রায় রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ ভ্রূণেরা কখনও প্রকৃত গরমের মুখোমুখি হয়নি। শুধু বাবা-মায়ের সতর্কতামূলক ডাকই তাদের মস্তিষ্কে এই পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী ব্যবস্থা তাপঘাতের সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জন্মের আগেই এই ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করে রাখলে ছানাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তবে এই কৌশলের একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যদি বাবা-মায়ের পাঠানো সতর্কবার্তা ভবিষ্যতের আবহাওয়ার সঙ্গে না মেলে, তাহলে এই আগাম প্রস্তুতি উল্টে ক্ষতির কারণ হতে পারে। দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ুর যুগে এমন পরিস্থিতি আরও বেশি ঘটতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। শুধু জেব্রা ফিঞ্চ নয়, অন্যান্য পাখি ও প্রাণীর ক্ষেত্রেও জন্মের আগে পরিবেশগত সংকেত মস্তিষ্ক ও রক্তনালির বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রাণীরা কীভাবে ভবিষ্যতের পরিবেশের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে, সে সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে এই গবেষণা।
সূত্র: Earth . com ; June ; 2026
