জলবায়ু বদলের মানসিক অভিঘাত

জলবায়ু বদলের মানসিক অভিঘাত

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় উঠে আসে তাপমাত্রা, কার্বন নিঃসরণ ও আর্থিক ক্ষতির হিসাব। কিন্তু এই বদলে যাওয়া পৃথিবী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে কি প্রভাব ফেলছে? বিশেষত, ভবিষ্যৎ নিয়ে শিশু ও তরুণদের মনে কতটা ভয়, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা জমছে? তীব্র গরমে শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, বন্ধ হয় মাঠে খেলাধুলো। কিশোরের মনে প্রশ্ন জাগে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখার অর্থ কী? তরুণদের কাছে জলবায়ু সংকট প্রভাব ফেলতে পারে পেশা, বাসস্থান, সম্পর্ক, এমনকি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তেও। প্রবীণদের কাছে তা হয়ে উঠতে পারে চেনা পরিবেশ ও জীবনযাত্রা হারানোর বেদনা। একই সংকট, অথচ জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তার মানসিক অভিঘাত আলাদা। ক্রমাগত তাপপ্রবাহ, বন্যা কিংবা জলের অভাবের খবর মনে প্রশ্ন জাগায়, এই বিপর্যয়ই কি একদিন স্বাভাবিক জীবন হয়ে উঠবে? অনেকেই হয়তো মুখে উদ্বেগের কথা বলেন না, কিন্তু সেই নীরব দুশ্চিন্তাও জলবায়ু উদ্বেগের অংশ। ৪৪টি দেশের ৩৮৮ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৮৩.৫ শতাংশ মানুষ আগের পাঁচ বছরে অন্তত একটি চরম জলবায়ুজনিত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। এমন অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেশি মানসিক উদ্বেগের যোগ পাওয়া গিয়েছে। গরমে ঘুমের ব্যাঘাত, বন্যায় পড়াশোনা বন্ধ, জীবিকা হারানো কিংবা বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়া—ক্রমে অনিশ্চয়তাই হয়ে ওঠে দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই মানসিক চাপ অবশ্য সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। কেউ বিপর্যয়ের পর নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারে, কেউ পারে না। কেউ শীতল ঘরে থাকার সামর্থ্য রাখে, কেউ বিদ্যুতের বিল মেটাতেই হিমশিম খায়। তাই জলবায়ু ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি একই সঙ্গে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। বিপর্যয় সামলে ওঠার ক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে আর্থিক সামর্থ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তার উপর। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি, কিন্তু শুধু বিপদের ছবি তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অভিযোজন, উদ্ভাবন, সম্মিলিত উদ্যোগ ও ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখানো। স্কুল, কলেজ ও পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশু-কিশোরেরা নিজেদের ভয় নিয়ে কথা বলতে পারে এবং সমস্যার সমাধানে অংশ নেওয়ার আত্মবিশ্বাস পায়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উন্নত পৃথিবী রেখে যাওয়ার অর্থ শুধু নির্মল বাতাস, নিরাপদ জল ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা নয়। তাদের দিতে হবে অনিশ্চয়তার মধ্যে বাঁচার মানসিক শক্তি, বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার বিশ্বাস। আমরা অনিশ্চয়তাহীন পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি দিতে পারি না। কিন্তু জলবায়ু সংকটের বাস্তবতা মেনেও হতাশার কাছে আত্মসমর্পণও করা যায় না। তবে প্রশ্ন একটাই, পরবর্তী প্রজন্ম কি জলবায়ু সংকটের ভয়কেই উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে, নাকি সেই পৃথিবী বদলে দেওয়ার সাহসটুকুও পাবে?

 

Down to Earth; October, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + twenty =