জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কার 

জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কার 

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৪ জুলাই, ২০২৬

১৪টি কুকুরের কামড়, এক মরিয়া মায়ের আর্তি। আর সেখান থেকেই শুরু আধুনিক জলাতঙ্ক প্রতিরোধের নতুন যুগ। ১৮৮৫ সালের ৬ জুলাই। প্যারিসের একটি সাধারণ পরীক্ষাগারে শুরু হল এক নতুন চিকিৎসা। তা শুধু একটি শিশুর জীবনই বাঁচায়নি, বদলে দিয়েছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসও। মাত্র নয় বছরের জোসেফ মাইস্টার। ফ্রান্সের আলসাস অঞ্চলে জলাতঙ্কে আক্রান্ত একটি কুকুর তাকে একবার নয়, ১৪ বার কামড়েছিল। সে সময় জলাতঙ্ক বা রেবিসে আক্রান্ত হওয়া প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ডের সমান ছিল। রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল কার্যত শূন্য। মাইস্টারের মা মারি-আঁজেলিক শুনেছিলেন, প্যারিসে এক বিজ্ঞানী কুকুরের উপর জলাতঙ্কের একটি পরীক্ষামূলক টিকা নিয়ে কাজ করছেন। শেষ আশ্রয় হিসেবে তিনি ছেলেকে নিয়ে ছুটে যান প্যারিসে। সেই বিজ্ঞানীই আধুনিক অণুজীববিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ লুই পাস্তুর।

 

প্রথমে পাস্তুর দ্বিধায় পড়েন। কারণ তিনি তো চিকিৎসক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন রসায়নবিদ ও বিজ্ঞানী। মানুষের উপর এই টিকা কখনও প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্যারিসের প্রখ্যাত চিকিৎসক জ্যাক-জোসেফ গ্রঁশে, পাস্তুরকে রাজি করান। ১৮৮৫ সালের ৬ জুলাই থেকে শুরু হয় চিকিৎসা। পরের ১০–১১ দিনে মাইস্টারকে একে একে ১২টি টিকার ডোজ দেওয়া হয়। টিকাটি মূলত তৈরি করেছিলেন পাস্তুরের সহকারী এমিল রু। সেই সময় মানুষের উপর এই চিকিৎসা ছিল সম্পূর্ণ পরীক্ষামূলক। উপরন্তু, চিকিৎসকের লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও পাস্তুরের এই উদ্যোগ আইনি ঝুঁকিও তৈরি করেছিল। কিন্তু সব আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠে ছোট্ট জোসেফ মাইস্টার। ইতিহাসে সে-ই প্রথম মানুষ, যে সফলভাবে পরীক্ষামূলক রেবিস টিকা গ্রহণ করে প্রাণে বাঁচে।

 

এই সাফল্যের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত মানুষ প্যারিসে আসতে শুরু করেন পাস্তুরের চিকিৎসার জন্য। এই অভূতপূর্ব সাফল্যই পরে প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে পাস্তুর ইনস্টিটিউটের। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে সংক্রামক রোগ গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অবশ্য পাস্তুরের অবদান শুধু রেবিস টিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গেজে ওঠার প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, খাদ্য সংরক্ষণের জন্য পাস্তুরাযন পদ্ধতির উদ্ভাবন এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণসৃষ্টির ধারণাকে ভুল প্রমাণ করা প্রভৃতি একাধিক যুগান্তকারী কাজ তাঁকে বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। তবে রেবিসের টিকা তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতিকে এক অন্য উচ্চতায় রাখে।

 

আর অন্যদিকে যে শিশু একদিন পাস্তুরের পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছিল, সেই জোসেফ মাইস্টার বড় হয়ে পাস্তুর ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। ১৯৪০ সালে, ৬৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। আজ, প্রায় দেড়শো বছর পরে, জলাতঙ্কের টিকা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। তবু রোগটি এখনও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। সম্প্রতি কানাডায় একটি ১১ বছরের শিশুর জলাতঙ্কে মৃত্যুর ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে দ্রুত টিকা নেওয়ার বিকল্প নেই। আর সেই জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার সূচনা হয়েছিল ১৮৮৫ সালের ৬ জুলাই, এক মায়ের মরিয়া আবেদন, এক বিজ্ঞানীর সাহসী সিদ্ধান্ত এবং এক ছোট্ট শিশুর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।

 

সূত্র: Nautilus ; July ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 2 =