জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি CRISPR আবারও বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন ফেলেছে। গবেষকরা প্রথমবার মানব কোষ থেকে ডাউন সিনড্রোমের জন্য দায়ী অতিরিক্ত ক্রোমোজোম সফলভাবে অপসারণ করতে পেরেছেন। এই সাফল্য ভবিষ্যতে জিনগত রোগের চিকিৎসায় এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। ডাউন সিনড্রোম, যার বৈজ্ঞানিক নাম ট্রাইসোমি ২১, এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষের স্বাভাবিক দুটি কপির বদলে ক্রোমোজোম ২১-এর তিনটি কপি থাকে। এই অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের কারণে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নানা ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে প্রতি ৭০০টি জন্মের মধ্যে প্রায় একটি শিশুর ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্ম হয়। এতদিন পর্যন্ত এটিকে একটি স্থায়ী জিনগত অবস্থা হিসেবেই ধরা হতো। কিন্তু বিজ্ঞানীরা CRISPR-Cas9 প্রযুক্তির একটি বিশেষ সংস্করণ তৈরি করেছেন, যা নির্দিষ্টভাবে অতিরিক্ত ক্রোমোজোম ২১-কে শনাক্ত করে কেটে ফেলতে পারে। গবেষণাটি এখনও পরীক্ষাগারের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। বিজ্ঞানীরা ডাউন সিনড্রোম আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সংগৃহীত ত্বকের কোষ এবং ল্যাবরেটরিতে তৈরি স্টেম সেলের ওপর এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। ফলাফল অত্যন্ত আশাপ্রদ। চিকিৎসার পর কোষগুলিতে ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের কারণে যেসব জিন অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় ছিল, তাদের কার্যকলাপও অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে। কোষের সামগ্রিক কার্যকারিতারও উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। এটি প্রমাণ করে যে ডাউন সিনড্রোমের মূল জিনগত ভারসাম্যহীনতাকে অন্তত কোষের স্তরে সংশোধন করা সম্ভব। এতদিন ডাউন সিনড্রোমের চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ ও সহায়ক পরিচর্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন এই পদ্ধতি একদিন রোগটির জৈবিক কারণকেই নিশানা করে চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই সাফল্যকে এখনই চিকিৎসার বিপ্লব হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ জীবন্ত মানুষের শরীরে একটি সম্পূর্ণ ক্রোমোজোম অপসারণ করা অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। CRISPR প্রযুক্তি কখনও কখনও ভুল জায়গায় জিন কেটে ফেলতে পারে, যাকে ‘অফ-টার্গেট এফেক্ট’ বলা হয়। এর ফলে নতুন জিনগত সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মানুষের শরীরে এই প্রযুক্তি প্রয়োগের আগে আরও বহু বছরের গবেষণা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা এখন এমন পদ্ধতি তৈরির চেষ্টা করছেন, যা আরও নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট কোষের ওপর কাজ করতে পারবে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের নিউরন ও গ্লিয়াল কোষের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোষে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে ডাউন সিনড্রোমের জটিলতা কমানোর পথ খুলতে পারে। এই গবেষণা শুধু ডাউন সিনড্রোমেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, একই কৌশল ভবিষ্যতে অন্যান্য ক্রোমোজোমজনিত রোগের ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে এডওয়ার্ডস সিনড্রোম (ট্রাইসোমি ১৮) এবং পাটাউ সিনড্রোম (ট্রাইসোমি ১৩)। এই দুই রোগই গুরুতর শারীরিক জটিলতা ও উচ্চ শিশুমৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত।
সূত্র: Hashizume, R., Wakita, S., Sawada, H., Takebayashi, S., Kitabatake, Y., Miyagawa, Y., Hirokawa, Y. S., Imai, H., & Kurahashi, H. (2025). “Trisomic rescue via allele-specific multiple chromosome cleavage using CRISPR-Cas9 in trisomy 21 cells.” PNAS Nexus, Volume 4, Issue 2.
