কম্পিউটারের পরিচিত রূপটা সাধারণত ইলেকট্রনিক সার্কিট, প্রসেসর আর বিদ্যুতের সাহায্যে তথ্যের প্রক্রিয়াকরণ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার এই গতানুগতিক রূপের বদলে এক ভিন্ন কম্পিউটার তৈরি করেছেন। যেটা প্রচলিত ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যবহার করছে ডিএনএ অণু। আয়ারল্যান্ডের মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা তৈরি করেছেন এই ডিএনএ-ভিত্তিক কম্পিউটার। এই কম্পিউটার অণুদের পারস্পরিক ক্রিয়ার সাহায্যে গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। গবেষণাটি নেচার পত্রিকায়, ‘A thermodynamically favoured molecular computer’ শিরোনামে সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে ।
স্ক্যাফোল্ডেড ডিএনএ কম্পিউটার নামক এই ব্যবস্থায় বিশেষভাবে নকশা করা ডিএনএ-সূত্র ব্যবহার করা হয়। এগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজিয়ে একটি আণবিক কাঠামো তৈরি করে। ডিএনএ-সূত্রগুলির এই বিন্যাস এবং পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্যেই হিসাবের তথ্য ও উত্তর নিহিত থাকে। প্রচলিত কম্পিউটারে যেমন ইলেকট্রনিক সংকেতের সাহায্যে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করা হয়, এখানে তেমনই ডিএনএ অণুর যুক্ত হওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং নির্দিষ্ট অবস্থান দখলের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গণনা সম্পন্ন হয়।
গবেষকেরা পরীক্ষা চলাকালীন এই কম্পিউটারের সাহায্যে ১০টি ভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম চালিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল যোগ, গুণ, ভাগ এবং বাইনারি সংখ্যা প্রণালীতে একের সংখ্যা জোড় না বিজোড়, তা শনাক্ত করা। একটি পরীক্ষায় কম্পিউটারটি ১০+৩ -এর হিসাব করতে প্রায় ৩০ সেকেন্ড সময় নেয়। লক্ষাধিক সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত জটিল হিসাব সম্পন্ন করতে অবশ্য ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগেছে। অর্থাৎ, গতি ও দক্ষতার দিক থেকে এই প্রযুক্তি এখনও প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
এই ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, কিছু প্রোগ্রামকে ভিন্ন ভিন্ন ইনপুট দিয়ে ২৫ বার পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। ফলে প্রতিবার নতুন করে গোটা ব্যবস্থাটি তৈরি না করেও একাধিক গণনা চালানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ডিএনএ কম্পিউটারের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হল এর ক্ষুদ্র আকার ও বিপুলসংখ্যক অণুকে কাজে লাগানোর ক্ষমতায়। প্রচলিত কম্পিউটারের মতো একটি নির্দিষ্ট প্রসেসরের ওপর নির্ভর না করে, ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক অণুকে একই সঙ্গে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই প্রযুক্তিকে বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এই গবেষণা থেকে প্রমাণ করল, ডিএনএ শুধু জীবদেহের বংশগত তথ্যই সংরক্ষণ করে না; তার ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যকে গণনার কাজেও লাগানো যায়। ভবিষ্যতে বিশেষ ধরনের আণবিক কম্পিউটিং প্রযুক্তির বিকাশে নির্দ্বিধায় এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সূত্র: Nature — “A thermodynamically favoured molecular computer.”
