একটি বই ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হলো। লেখক একজন স্বশিক্ষিত স্কুলশিক্ষক। বইটি নিয়ে তেমন আলোচনা হলো না, বিক্রি হলো সামান্য, আর ধীরে ধীরে তা চলে গেল গ্রন্থাগারের তাকের অন্ধকারে। কেউ ভাবতেও পারেনি, প্রায় এক শতাব্দী পরে সেই বইয়ের ধারণা আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতার ভিত গড়ে দেবে। লেখকের নাম জর্জ বুল। বইটির নাম অন ‘ইনভেস্টিগেশন অব দ্য লজ অব থট’।
১৮১৫ সালে ইংল্যান্ডের লিঙ্কন শহরে জন্ম বুল-এর। পরিবারে আর্থিক অনটন ছিল চরম। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়। কিন্তু শেখার ক্ষুধা থামেনি। নিজে নিজেই শিখলেন লাতিন, গ্রিক, ফরাসি, জার্মান ও ইতালীয় ভাষা। পরে একইভাবে আয়ত্ত করলেন গণিত। মাত্র ১৯ বছর বয়সে খুললেন নিজের স্কুল। ২৪ বছর বয়সে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে শুরু করলেন। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল না, কোনো প্রভাবশালী পরামর্শদাতা ছিলেন না। তবু ১৮৪৯ সালে আয়ারল্যান্ডের কুইন্স কলেজ, কর্ক তাঁকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।
বুলের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল একটি সাহসী ধারণা উপস্থাপন করা – যুক্তিকেও কি গণিতের মতো লেখা যায়? তাঁর আগে যুক্তিবিদ্যা ছিল মূলত দর্শনের বিষয়। মানুষ যুক্তি দিত বাক্যে, অনুচ্ছেদে, ভাষার মাধ্যমে। বুল সেই ভাষাকে নামিয়ে আনলেন প্রতীকে। তিনি দেখালেন, যুক্তির অনেক সম্পর্ককে দুটি মান দিয়ে প্রকাশ করা যায়—সত্য বা মিথ্যা, ১ বা ০। এই ভিত্তির ওপর তৈরি হলো ‘এবং’ (AND), ‘অথবা’ (OR) এবং ‘নয়’ (NOT) এর মতো যৌক্তিক ক্রিয়া। আজ এগুলো এত পরিচিত যে প্রায় স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি ছিল বিপ্লবী চিন্তা। তখনও কেউ বুঝতে পারেনি, এই বিমূর্ত অঙ্ক একদিন যন্ত্রকে চিন্তা করাতে সাহায্য করবে।
কিছু যুক্তিবিদ বইটি পড়লেন, আলোচনা করলেন, তারপর সেটি ইতিহাসের আড়ালে চলে গেল। প্রায় ৮৩ বছর ধরে বুলের ধারণা ছিল এক ধরনের ঘুমন্ত বীজের মতো। এরপর মঞ্চে এলেন আরেক তরুণ। ১৯৩৭ সালে এমআইটির ২১ বছর বয়সি ছাত্র ক্লড শ্যানন বৈদ্যুতিক রিলে সার্কিট নিয়ে কাজ করছিলেন। সুইচ হয় খোলা, নয় বন্ধ। বিদ্যুৎ হয় প্রবাহিত হয়, নয় হয় না। শ্যানন হঠাৎ বুঝলেন, এ তো বুল-এর সেই ০ এবং ১। খোলা সুইচ = ০, বন্ধ সুইচ = ১। দুটি সুইচ সিরিজে যুক্ত থাকলে উভয়ই বন্ধ না হলে বিদ্যুৎ যাবে না = AND। সমান্তরালে যুক্ত থাকলে যেকোনো একটি বন্ধ থাকলেই বিদ্যুৎ যাবে = OR । শ্যানন প্রমাণ করলেন, বুলের যুক্তিবিদ্যাকে বাস্তব সার্কিট দিয়ে তৈরি করা সম্ভব। এটাই আধুনিক ডিজিটাল কম্পিউটারের জন্মের ভিত্তি।
এখনও যখন আপনি ফোন আনলক করেন, একটি ওয়েবসাইটে লগ ইন করেন, সার্চ করেন, ছবি তোলেন, ভিডিও দেখেন বা কোনো এআই-এর সঙ্গে কথা বলেন— তখন অগণিত ক্ষুদ্র ট্রানজিস্টর প্রতি সেকেন্ডে বুলীয় অপারেশন সম্পাদন করছে। প্রতিটি শর্তভিত্তিক নির্দেশনা প্রতিটি AND/OR শর্ত, প্রতিটি ডিজিটাল সার্কিটের গভীরে রয়েছে সেই একই ধারণা। সত্য কিংবা মিথ্যা। ১ কিংবা ০। এক স্বশিক্ষিত স্কুলশিক্ষকের বিমূর্ত অঙ্কই আজকের ডিজিটাল বিশ্বের ব্যাকরণ হয়ে উঠেছে। এটাই হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে আশ্চর্য বিলম্বিত প্রভাব যুক্ত একটি বই, যা প্রকাশের পর প্রায় কেউ পড়েনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাই বদলে দিল পৃথিবীর প্রতিটি কম্পিউটারের ক্রিয়া।
