তরুণ অধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি 

তরুণ অধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ জুলাই, ২০২৬

ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে আমাদের কিছু বদ্ধমূল ধারণা আছে। যেমন ফুসফুসে ক্যানসার মানেই সে দীর্ঘদিন ধরেই ধূমপান করেছে, সে নিশ্চয়ই বয়স্ক মানুষ এবং অবশ্যই পুরুষ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি ভিন্ন প্রবণতা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো ভাবাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ৫০ বছরের কম বয়সী অধূমপায়ী তরুণ-তরুণীদের, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের হার বাড়ছে। এই উদ্বেগজনক প্রবণতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া (ইউ এস সি) নরিস কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টার-এর গবেষকরা একটি অপ্রত্যাশিত তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব তরুণ অধূমপায়ী নিয়মিত বেশি পরিমাণে ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যজাত খাবার খান, তাঁদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যকর খাবার ক্যানসারের কারণ নয়। তাঁদের ধারণা, প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করা ফল, শাকসবজি ও শস্যে থেকে যাওয়া কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ হয়তো এই ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও এই ধারণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি নিশ্চিত করতে আরও বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে এপিডেমিওলজি অব ইয়াং লাং ক্যানসার প্রজেক্ট-এর আওতায়। এতে ৫০ বছর বা তার কম বয়সে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ১৮৭ জন রোগীর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপানের ইতিহাস, ব্যক্তিগত তথ্য এবং রোগের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই কখনও ধূমপান করেননি এবং তাঁদের ক্যানসারের ধরনও ছিল ধূমপানের কারণে হওয়া প্রচলিত ফুসফুসের ক্যানসার থেকে জৈবিকভাবে ভিন্ন।

গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস মূল্যায়নের জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্য সূচক (HEI) ব্যবহার করেন, যা ১ থেকে ১০০-এর মধ্যে খাদ্যের গুণমান নির্ধারণ করে। গবেষণায় অংশ নেওয়া তরুণ অধূমপায়ীদের গড় HEI স্কোর ছিল ৬৫, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের গড় স্কোর ৫৭। অর্থাৎ, ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাস গড় মানুষের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্যকর ছিল। বিশেষ করে যেসব নারী পুরুষদের তুলনায় বেশি ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যজাত খাবার খেতেন তাঁদের মধ্যেই ফুসফুসের ক্যানসারের হারও বেশি দেখা গেছে।

গবেষকদের মতে, এই ফলাফলের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সম্ভবত কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ। প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফল, শাকসবজি ও শস্যে সাধারণত মাংস, দুগ্ধজাত খাবার বা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের তুলনায় বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকে। অতীতের একাধিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, দীর্ঘদিন কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকা কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি। সেই তথ্যই বর্তমান গবেষণার এই সম্ভাব্য ব্যাখ্যাকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে গবেষণাটির একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের খাওয়া প্রতিটি খাবারে কীটনাশকের প্রকৃত মাত্রা সরাসরি পরিমাপ করেননি। বরং বিভিন্ন খাদ্যশ্রেণিতে গড়ে কতটা কীটনাশক অবশিষ্ট থাকে, সেই প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য সংস্পর্শের হিসাব করা হয়েছে। ফলে এই গবেষণা থেকে সরাসরি কার্য-কারণ সম্পর্ক প্রমাণ করা যায় না। এ কারণে গবেষণার পরবর্তী ধাপে অংশগ্রহণকারীদের রক্ত ও মূত্রে কীটনাশকের মাত্রা সরাসরি পরিমাপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো কীটনাশক ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে বেশি জড়িত কি না, তা বোঝার চেষ্টা করবেন বিজ্ঞানীরা।

এই গবেষণা তরুণ অধূমপায়ীদের মধ্যে বাড়তে থাকা ফুসফুসের ক্যানসারের সম্ভাব্য পরিবেশগত কারণ খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা। তবে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকর ফল, শাকসবজি বা পূর্ণ শস্য খাওয়া কমিয়ে দেওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং কীটনাশকের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করাই ভবিষ্যৎ গবেষণার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

 

সূত্র: University of Southern California – Health Sciences. “Why are healthy young non-smokers developing lung cancer?.” ScienceDaily. 13 July 2026. <www.sciencedaily.com/releases/2026/07/260712011758.htm>.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 1 =