তাকাই, কিন্তু দেখি না

তাকাই, কিন্তু দেখি না

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

‘’অনেক খুঁজেছি, কোথাও নেই!” অথচ আরেকজন এসে একই জায়গায় একবার তাকিয়েই জিনিসটি খুঁজে বের করে দিল। তারপর পরিচিত মন্তব্য— ‘’এ তো চোখের সামনেই ছিল!” প্রায় সব বাড়িতেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। এ কিন্তু শুধু অসাবধানতা নয়, এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের কাজ করার বিশেষ ধরন। দৈনন্দিন জীবনে কোনো জিনিস খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ভিজ্যুয়াল সার্চ। আর এই কাজে আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় নিখুঁতভাবে পটু নয়। অর্থাৎ, আমরা তাকিয়ে থাকি, কিন্তু দেখি না। প্রথমে মনে হতে পারে, কিছু খোঁজা খুব সহজ কাজ। টেবিল, রান্নাঘরের তাক একটু দেখলেই তো জিনিস পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে মস্তিষ্ক একসঙ্গে সবকিছু বিশ্লেষণ করতে পারে না। তাই সে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেছে বেছে দেখে, বাকিটা উপেক্ষা করে। মনোবিজ্ঞানীরা এই মনোযোগকে অনেক সময় ‘স্পটলাইট’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। যেখানে মনোযোগের আলো পড়ে, সেখানকার তথ্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, বাকি অংশে নজর কম যায়। এর সঙ্গে চোখের গঠনেরও সম্পর্ক আছে। আমাদের রেটিনার মাঝখানের ছোট অংশ, ফোভিয়া বা পীতবিন্দু সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে দেখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই অংশটি খুবই ছোট। তাই চারপাশ ভালোভাবে দেখতে চোখকে বারবার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নড়াতে হয়। চোখের এই দ্রুত নড়াচড়াকে বলা হয় স্যাকেডস। আমরা স্থির তাকিয়ে আছি মনে হলেও চোখ আসলে প্রতি মুহূর্তে ছোট ছোট লাফ দিয়ে বিভিন্ন জায়গা দেখে। সাধারণত এই ব্যবস্থা ভালোই কাজ করে। তবে দেখা তো শুধু চোখের কাজ নয়, মস্তিষ্ক কী আশা করছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা একে বলেন মনোযোগজনিত অন্ধত্ব। এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ রয়েছে। একটি ভিডিওতে কিছু মানুষকে বাস্কেটবল পাস করতে দেখা যায়। দর্শকদের বলা হয়, কতবার পাস হচ্ছে তা গুনতে। এই সময় গোরিলার পোশাক পরা একজন মানুষ মাঝখান দিয়ে হেঁটে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক দর্শক তাকে দেখতেই পান না। কারণ, মস্তিষ্ক তখন পাস গোনার কাজে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে সেটিকে গুরুত্ব দেয়নি। ঠিক একই ঘটনা ঘটে যখন আমরা চাবি বা চশমা খুঁজে পাই না, অথচ তা সামনেই পড়ে থাকে। মানুষ জিনিস খোঁজার সময় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। কেউ ধীরে ও নিয়ম মেনে চোখ সরান। কেউ আবার দ্রুত চোখ ঘোরান। যারা নিয়ম মেনে খোঁজেন, তারা অগোছালো জায়গাতেও ছোট জিনিস সহজে খুঁজে পান। কারণ তারা বেশি অংশ দেখেন। অন্যদিকে তাড়াহুড়ো করে খুঁজলে কিছু অংশ বাদ পড়ে যায়। তখন জিনিস সামনে থাকলেও চোখে পড়ে না। এমনকি নারী ও পুরুষের মধ্যে এই দক্ষতায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ব্যাপারে অভ্যাস, মনোযোগ, অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ সম্পর্কে পরিচিতির গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই পরের বার কেউ যদি বলে, “সবখানে খুঁজেছি, তবুও পেলাম না”- তাতে ধরে নিতে হবে হয়তো তিনি খুঁজেছেন ঠিকই, কিন্তু ঠিকভাবে খোঁজেননি।

 

সূত্র: The Conversation, April, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 3 =