তামাক গাছের নিকোটিন রহস্য

তামাক গাছের নিকোটিন রহস্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩১ মে, ২০২৬

তামাক গাছ কীভাবে নিকোটিন তৈরি করে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের লেগে গেল প্রায় ২০০ বছর। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আবিষ্কার শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞানেই বড় অগ্রগতি নয়, ভবিষ্যতে ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

অনেক বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা তামাক গাছকে “জীবন্ত কারখানা” হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। ল্যাবরেটরিতে তামাক গাছের মাধ্যমে ভ্যাকসিন, অ্যান্টিবডি ও বিভিন্ন ওষুধজাতীয় উপাদান তৈরি করা হয়। কিন্তু একটি বড় সমস্যা ছিল, উৎপাদিত প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে অবাঞ্ছিত নিকোটিনও তৈরি হয়ে যেত। ওষুধে নিকোটিন থাকা বিপজ্জনক, তাই পরে তাকে আলাদা করতে অতিরিক্ত সময় ও টাকা খরচ হতো।

এই সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে জানা দরকার, তামাক গাছ ঠিক কীভাবে নিকোটিন তৈরি করে। ১৮২৮ সালে জার্মান রসায়নবিদ পোসেল্ট ও রেইম্যান প্রথম বিশুদ্ধ নিকোটিন আলাদা করেন। কিন্তু গাছের ভেতরে এটি তৈরি হওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটা এতদিন অজানাই ছিল।

ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. বেঞ্জামিন লিচম্যান ও তাঁর সহকর্মীরা এবার সেই রহস্য উন্মোচন করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, নিকোটিন তৈরির সময় তামাক গাছ এক ধরনের রাসায়নিক কৌশল ব্যবহার করে। গাছটি প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে গ্লুকোজ যুক্ত করে। এই গ্লুকোজ অণুটিকে সক্রিয় করে তোলে, যাতে পরে তা সহজে নিকোটিনের মূল গঠন তৈরি করতে পারে। কাজ শেষ হলে গাছ আবার সেই গ্লুকোজ সরিয়ে ফেলে। ফলে চূড়ান্ত নিকোটিন অণুতে গ্লুকোজের কোনো চিহ্নই থাকে না। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা এতদিন বিভ্রান্ত ছিলেন।

নিকোটিন মূলত দুটি আলাদা রাসায়নিক রিং বা বলয় গঠন নিয়ে তৈরি। গবেষকেরা চারটি বিশেষ উৎসেচক শনাক্ত করেছেন, যেগুলো ধাপে ধাপে এই দুটি অংশকে জুড়ে সম্পূর্ণ নিকোটিন তৈরি করে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচকের নাম দেওয়া হয়েছে “NicGS”। এটিই মূলত নিকোটিনের চূড়ান্ত গঠন তৈরি করে।

গবেষকেরা পরে এই চারটি উৎসেচক অন্য একটি তামাকজাতীয় গাছের পাতায় ব্যবহার করে পরীক্ষা চালান। দেখা গেল সেই পাতাতেও সফলভাবে নিকোটিন তৈরি হয়। এতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তাঁরা সত্যিই নিকোটিন তৈরির রাস্তা আবিষ্কার করে ফেলেছেন।

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো—এখন বিজ্ঞানীরা চাইলে এমন তামাক গাছ তৈরি করতে পারবেন, যা নিকোটিন তৈরি করবে না। ফলে ওষুধ উৎপাদনের সময় অতিরিক্ত পরিশোধনের দরকার কমে যাবে। একই সঙ্গে এই গবেষণা ভবিষ্যতে উদ্ভিদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আরও জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া বুঝতেও সাহায্য করতে পারে।

 

সূত্র: Nature communications

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − 11 =