তিন বছরের সমুদ্রযাত্রা শেষে বিপদের মুখে বিশাল হিমশৈল

তিন বছরের সমুদ্রযাত্রা শেষে বিপদের মুখে বিশাল হিমশৈল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ নভেম্বর, ২০২৬

অ্যান্টার্কটিকার বরফের আচ্ছাদন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে দক্ষিণ মহাসাগরে ভেসে চলেছে বিশাল হিমশৈল A-81। হাজার হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে সেটি এখন দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের প্রত্যন্ত দ্বীপ দক্ষিণ জর্জিয়ার কাছে পৌঁছেছে। তবে দ্বীপটির চারপাশে সমুদ্রের তলদেশে থাকা অগভীর ভূখণ্ডে আটকে পড়তে পারে হিমশৈলটি। অতীতে এই অঞ্চলে আটকে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে অন্য এক বিশাল হিমশৈলও। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর নাসার টেরা উপগ্রহে তোলা ছবিতে A-81-কে দক্ষিণ জর্জিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে।

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্টার্কটিকার ব্রান্ট আইস শেলফ / অ্যান্টার্কটিকার কেয়ার্ড উপকূল বরাবর অবস্থিত একটি বিশাল ভাসমান বরফস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় A-81। তখন এর আয়তন ছিল প্রায় ১,৫৫০ বর্গকিলোমিটার। এত বিশাল আকারের হিমশৈলটি সঙ্গে সঙ্গে খোলা সমুদ্রে পৌঁছতে পারেনি। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি ওয়েডেল সাগরে ঘুরে বেড়ায়। হিমশৈলটির এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ওয়েডেল গায়র/ কুন্ডলী নামে পরিচিত বিশাল জলরাশির একটা চক্রাকার আবর্তন (ঘূর্ণনটি ছিল মূলত ঘড়ির কাঁটার দিকে)। এই স্রোত হিমশৈলটিকে অ্যান্টার্কটিকার উপকূল বরাবর এগিয়ে নিয়ে যায়।

২০২৬ সালের মে মাসে A-81 অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তর প্রান্তে পৌঁছয়। সেখান থেকে এটি স্কোশিয়া সাগরে প্রবেশ করে এবং উত্তর দিকে এগিয়ে যায়। অক্টোবরের শেষ নাগাদ হিমশৈলটি তার উৎপত্তিস্থল ব্রান্ট বরফের স্তর থেকে প্রায় ২,৩০০ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে পৌঁছে গিয়েছিল।

দক্ষিণ জর্জিয়ার কাছে এসে হিমশৈলটির গতি কমে যায়। অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া দপ্তরের জান লিজার এবং মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত গবেষক ক্রিস্টোফার শুম্যানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হিমশৈলটি সম্ভবত দ্বীপটির চারপাশে থাকা মহীসোপানের কিনারায় বাধা পাচ্ছে। মহীসোপান অর্থাৎ, সমুদ্রের তলদেশের এই অপেক্ষাকৃত অগভীর অঞ্চল ওই বিশাল হিমশৈলের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। হিমশৈলের নিমজ্জিত অংশ তলদেশের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে সেটি আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

২০২৫ সালে A-23A নামে আরেকটি বিশাল হিমশৈল দক্ষিণ জর্জিয়ার কাছে মহীসোপানে আটকে পড়েছিল। পরে সেটি ভেঙে ছোট ছোট টুকরোয় পরিণত হয়। A-81-এর পরিণতিও একই রকম হবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

A-81-এর জন্মের সূত্রপাত কয়েক দশক আগে। ব্রান্ট বরফের স্তরটি কাজম-১ নামে একটি বড় ফাটলে প্রায় ৩৫ বছর ধরে স্থিতিশীল ছিল। ২০১২ সালের দিকে সেটি আবার বাড়তে শুরু করে এবং ২০১৯ সালের মধ্যে দ্রুত বিস্তৃত হয়। অবশেষে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বরফের বিশাল অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে A-81 তৈরি হয়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে বলে ‘ক্যালভিং’।

ব্রান্ট বরফের স্তর থেকে ২০২১ সালে A-74 এবং ২০২৪ সালে A-83 নামে আরও দুটি হিমশৈল বিচ্ছিন্ন হয়। এই অঞ্চলে ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের হ্যালি গবেষণাকেন্দ্র থাকায় বরফের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্টার্কটিকার বরফ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সমুদ্রস্রোতের প্রভাবে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি নির্ধারণ করে সমুদ্রের স্রোত, তাপমাত্রা এবং সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি।

সূত্র: Giant Antarctic iceberg approaches remote island after three-year journey, earth.com 27 October 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × five =