তিব্বতে মানব বিবর্তন অব্যাহত

তিব্বতে মানব বিবর্তন অব্যাহত

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ জুন, ২০২৬

মানব বিবর্তন অতীত হয়ে যায়নি; এটি আজও চলমান। সম্প্রতি তিব্বত ও নেপালের উচ্চভূমি নিবাসী মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক নির্বাচন এখনও মানুষের শরীরকে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য পরিবর্তিত করে চলেছে।

তিব্বত মালভূমি পৃথিবীর উচ্চতম বাসযোগ্য অঞ্চল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,৫০০ মিটার বা তারও বেশি উচ্চতায় সেখানকার বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম থাকে। সাধারণত এমন পরিবেশে থাকতে গেলে মানুষের উচ্চতাজনিত অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতাও দেখা দিতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে এই অঞ্চল নিবাসী তিব্বতি জনগোষ্ঠী আশ্চর্যজনকভাবে এই চরম পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

গবেষকরা নেপাল ও তিব্বতের ৪১৭ জন মহিলার ওপর গবেষণা চালান, যাঁরা আজন্ম ৩,৫০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় বসবাস করেছেন। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল কোন শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং অধিক সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে সহায়তা করে তা খুঁজে বের করা। কারণ বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব বৈশিষ্ট্য বেঁচে থাকা ও প্রজননে সুবিধা দেয়, সেগুলোই পরবর্তী প্রজন্মে বেশি ছড়িয়ে পড়ে।

দেখা যায়, যেসব মহিলার রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বেশি ছিল এবং যাঁদের শরীর ফুসফুস থেকে অক্সিজেন দক্ষতর ভাবে সারা দেহে পৌঁছে দিতে পারে, তাঁদের সন্তানসংখ্যাও তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়া তাঁদের হৃদ্‌যন্ত্রের বাম নিলয় তুলনামূলকভাবে বড় , যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত আরও কার্যকরভাবে পাম্প করতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে চমকের বিষয় হলো, এই সুবিধাগুলো কিন্তু উচ্চ হিমোগ্লোবিনের কারণে নয়। সাধারণত কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে মানুষের শরীর বেশি হিমোগ্লোবিন তৈরি করে, যাতে রক্ত আরও বেশি অক্সিজেন বহন করতে পারে। কিন্তু অত্যধিক হিমোগ্লোবিন আবার রক্তকে ঘন করে তোলে, ফলে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, তিব্বতিদের ক্ষেত্রে মাঝারি মাত্রার হিমোগ্লোবিন এবং অত্যন্ত কার্যকর অক্সিজেন পরিবহন ব্যবস্থাই সবচেয়ে উপকারী অভিযোজন।

গবেষকদের মতে, এই বৈশিষ্ট্যগুলো গত ১০,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে। যাঁদের শরীর উচ্চতায় বেশি কার্যকরভাবে কাজ করতে পেরেছে, তাঁদের বেঁচে থাকা ও সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনাও বেশি ছিল। ফলে সেই উপকারী বৈশিষ্ট্যগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মে আরও সর্বব্যাপী হয়ে উঠেছে।

এই গবেষণার অন্যতম গবেষক নৃবিজ্ঞানী সিন্থিয়া বেল বলেছেন, এই গবেষণা মানুষের চলমান বিবর্তনের একটি অত্যন্ত স্পষ্ট উদাহরণ।

মানুষ এখনও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের জৈবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করছে। তিব্বতি জনগোষ্ঠীর এই অভিযোজন শুধু মানব বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানই বাড়ায় না, বরং ভবিষ্যতে উচ্চতাজনিত রোগ ও অক্সিজেন-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসমস্যা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 

সূত্র:Proceedings of the National Academy of Sciences (PNAS)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 4 =