দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease বা CKD) আজ বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সংকট। প্রায় ৮০ কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত, অথচ এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো এতটাই নীরব যে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ে তখন, যখন কিডনির বড়ো রকম ক্ষতি হয়ে গেছে। কিডনির কার্যক্ষমতা ক্রমশ কমতে থাকলে রোগীরা কিডনি বিকল হওয়া, হৃদরোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং অকালমৃত্যুর মতো গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েন। বিশেষ করে যেসব রোগীর ডায়াবেটিস নেই, তাদের জন্য কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত ছিল। তবে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা সেই চিত্র বদলে দিতে পারে।
সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসাবিষয়ক পত্রিকা নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফিনেরেনোন (Finerenone) নামের একটি ওষুধ ডায়াবেটিসবিহীন দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রেও সুরক্ষা দিতে সক্ষম। এর আগে ওষুধটি মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগের চিকিৎসায় সফলতা দেখিয়েছিল। কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো প্রমাণ মিলল যে এর উপকারিতা আরও অনেক বিস্তৃত হতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টার গ্রোনিনজেনের গবেষক হিদ্দো ল্যামবার্স হারস্পিংকের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক FIND-CKD ট্রায়ালে ১,৫৮৪ জন ডায়াবেটিসবিহীন CKD রোগী অংশ নেন। তাদের সবার কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গিয়েছিল এবং প্রস্রাবে উচ্চমাত্রার প্রোটিন পাওয়া গিয়েছিল, যা কিডনির ক্ষতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। অংশগ্রহণকারীদের একদলকে ফিনেরেনোন এবং অন্যদলকে ছদ্ম ওষুধ বা প্লাসিবো দেওয়া হয়। পাশাপাশি সবাই প্রচলিত মানসম্মত চিকিৎসা গ্রহণ করছিলেন। গবেষকরা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তাদের স্বাস্থ্যগত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন।
এই গবেষণার ফল ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। দেখা যায়, ফিনেরেনোন গ্রহণকারী রোগীদের কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাসের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে। কিডনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে রক্ত পরিশোধন করছে, তা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত eGFR সূচকে তাদের অবনতি প্লাসিবো গ্রুপের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ ওষুধটি কিডনির স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখতে সাহায্য করেছে।
শুধু তাই নয়, কিডনির গুরুতর জটিলতা, হৃদ্যন্ত্রের বৈকল্যের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফিনেরেনোন গ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে ১৩.৯ শতাংশের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা দেখা গেছে, যেখানে প্লাসিবো গ্রুপে এই হার ছিল ১৬.৯ শতাংশ। গবেষকদের হিসাবে, এটি সামগ্রিক ঝুঁকি প্রায় ২৩ শতাংশ কমিয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফিনেরেনোন প্রস্রাবে প্রোটিনের মাত্রা কমাতেও সক্ষম হয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে এই ওষুধ গ্রহণকারী রোগীদের প্রস্রাবে প্রোটিনের পরিমাণ গড়ে ৪১ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়, যেখানে প্লাসিবো গ্রুপে এই হ্রাস ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রস্রাবের প্রোটিন কমে যাওয়াকে কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার এক শক্তিশালী নির্দেশক হিসেবে ধরা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের অর্ধেকেরও বেশির অন্তত ৩০ শতাংশ প্রোটিন হ্রাসের ক্ষমতা দেখা গেছে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা। গবেষকরা জানিয়েছেন, এই গোষ্ঠীর রোগীদের মধ্যে ফিনেরেনোন নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে এবং গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি।
বিশ্বব্যাপী CKD রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নন। ফলে এই গবেষণার ফলাফল কোটি কোটি মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিনেরেনোন ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসবিহীন দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কিডনির কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করা, হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং রোগীদের জীবনমান উন্নত করার ক্ষেত্রে এটি এক যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সূত্র: Finerenone in Persons with Chronic Kidney Disease without Diabetes” by Hiddo J.L. Heerspink, Brendon L. Neuen, Rajiv Agarwal, David Z.I. Cherney, Carolyn S.P. Lam, Katherine R. Tuttle, Christoph Wanner, Pantelis Sarafidis, Niels Jongs, J. David Smeijer, Meike Brinker, Nicole Rethemeier, Patrick Schloemer, Paula Vesterinen, David Goldsbury, Sara Dizayee, Jon W. Mares and Vlado Perkovic, 3 June 2026, New England Journal of Medicine.DOI: 10.1056/NEJMoa2604625
