দীর্ঘায়ুর উত্তরাধিকারের জিন রহস্য 

দীর্ঘায়ুর উত্তরাধিকারের জিন রহস্য 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ জুলাই, ২০২৬

দীর্ঘ জীবন মানেই সুস্থ জীবন নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু সেই অতিরিক্ত বছরগুলোর বড় অংশই অনেকের ক্ষেত্রে কাটে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, স্মৃতিভ্রংশ কিংবা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে। তাই এখন বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য শুধু আয়ু বাড়ানো নয়, সুস্থ জীবনের পরিসর বাড়ানো। অর্থাৎ জনসাধারণকে এমন একটা সময়কাল উপহার দেওয়া, যখন একজন মানুষ দীর্ঘস্থায়ী রোগ ও মানসিক অবক্ষয় ছাড়াই সুস্থ, স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারে।

সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের লেইডেন ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারের গবেষকেরা এমন পরিবারগুলোর ওপর নজর দিয়েছেন, যাদের সদস্যরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তাঁদের গবেষণায় এমন কিছু বিরল জিনগত পরিবর্তনের সন্ধান মিলেছে, যা দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণাটি ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান জেনেটিক্সের (ই এস এইচ জি) বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপিত হয়েছে।

দীর্ঘায়ু নিয়ে প্রচলিত গবেষণার বেশিরভাগই হয় কোনো না কোনো একক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার পেছনে খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, শিক্ষা, আর্থসামাজিক অবস্থা কিংবা পরিবেশ প্রভৃতি নানা বিষয় প্রভাব ফেলে। ফলে জিনের প্রকৃত ভূমিকা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতেই গবেষকেরা এমন পরিবারকে বেছে নিয়েছেন, যেখানে একাধিক প্রজন্ম ধরে সদস্যরা গড় আয়ুর তুলনায় অনেক বেশি দিন সুস্থ জীবন কাটিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই পারিবারিক পদ্ধতি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার আরও নির্ভরযোগ্য পথ।

গবেষণায় লেইডেন আয়ু সমীক্ষার অন্তর্ভুক্ত ২১২টি দীর্ঘায়ু ভাইবোনের পরিবারের জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা প্রায় ২০ হাজার জিনের পরিবর্তে দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে অনুমিত চারটি নির্দিষ্ট জিনগত অঞ্চলের ৩৫০টি জিনের ওপর বিশদ অনুসন্ধান চালান। এই বিশ্লেষণে ১২টি বিরল প্রোটিন-পরিবর্তনকারী জিনের প্রকার শনাক্ত হয়, যেগুলো দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি ছিল CGAS (Cyclic GMP-AMP Synthase) জিনের একটি বিরল প্রকার। এই জিন শরীরের সহজাত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। কোষের অস্বাভাবিক স্থানে ডিএনএ শনাক্ত হলে এটি প্রদাহজনিত প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া চালু করে। গবেষকদের ধারণা, দীর্ঘায়ু পরিবারগুলোর সদস্যদের ক্ষেত্রে CGAS জিনের কার্যকারিতা আংশিক কম থাকায় শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু সংক্রমণ প্রতিরোধ ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামতের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থেকেছে। অর্থাৎ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই তাঁদের দীর্ঘদিন সুস্থ থাকার অন্যতম জৈবিক ভিত্তি হতে পারে।

তবে গবেষকেরা বলেছেন, এই ফলাফলকে এখনই চিকিৎসায় প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। কারণ, CGAS-এর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে সংক্রমণ ও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার অতিরিক্ত সক্রিয় থাকলে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এই জিনের সঠিক ভূমিকা বোঝার জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

পরবর্তী ধাপে জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য বায়োলজি অব এজিং-এর গবেষকেরা স্বল্পায়ু মেরুদণ্ডী প্রাণী কিলিফিশ-এর শরীরে এই জিনগত পরিবর্তন প্রয়োগ করে পরীক্ষা করবেন। যদি দেখা যায়, এই পরিবর্তন সত্যিই আয়ু ও সুস্থ থাকার সময়কাল দুটোই বাড়ায়, তবে তা বার্ধক্যবিজ্ঞান গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ভবিষ্যতে বার্ধক্য সংক্রান্ত চিকিৎসায় এ ধরনের বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যই হয়তো নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।

 

সূত্র: Why Some Families Stay Healthy for Decades Longer By European Society of Human Genetics, July 8, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 + 10 =