দৃষ্টিকোণ-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ রং 

দৃষ্টিকোণ-নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ রং 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৫ জুন, ২০২৬

প্রকৃতিতে আমরা এমন অনেক রং দেখি যা কোনো রঞ্জক পদার্থ থেকে তৈরি নয় অথচ কী মনোমুগ্ধকর। ময়ূরের পালক, প্রজাপতির ডানা বা কিছু পাখির ঝলমলে রং আসলে তাদের সূক্ষ্ম গঠন বা কাঠামোর কারণে তৈরি হয়। এই ধরনের রংকে বলা হয় স্ট্রাকচারাল কালার বা গঠনগত রং। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই এমন কৃত্রিম উপাদান তৈরির চেষ্টা করছেন যা রাসায়নিক রঞ্জক ছাড়াই উজ্জ্বল ও টেকসই রং সৃষ্টি করতে পারে। এবার দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকরা সেই লক্ষ্য পূরণের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ করেছেন।

তারা এমন এক নতুন ধরনের ‘ফোটোনিক গ্লাস’ তৈরি করেছেন, যা দৃশ্যমান আলোর পুরো বর্ণালী জুড়ে অত্যন্ত বিশুদ্ধ রং তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেখার কোণ পরিবর্তন করলেও এই রং বদলায় না। এতদিনের একটি বড় সমস্যা ছিল, খাঁটি লাল রং কীভাবে তৈরি করা যায়; এবার সেটাও সম্ভব হয়েছে।

সাধারণ পেইন্টে রাসায়নিক রঞ্জক থাকে, যা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো প্রতিফলিত করে এবং অন্য আলো শোষণ করে। কিন্তু স্ট্রাকচারাল কালারের ক্ষেত্রে রং নির্ভর করে উপাদানের অভ্যন্তরীণ ন্যানোস্কেল গঠনের ওপর। এর ফলে রং অনেক বেশি টেকসই হয়, সূর্যের আলোয় সহজে বিবর্ণ হয় না, জলের সংস্পর্শে এলেও রঞ্জক পদার্থ বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

এর আগে বিজ্ঞানীরা কোলয়েডাল ফোটোনিক গ্লাস ব্যবহার করে দৃষ্টিকোণ-নিরপেক্ষ রং তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে সেখানে একটি বড় সমস্যা ছিল। এই উপাদানগুলো ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল আলোকে বেশি ছড়িয়ে দেয়, যা রেলি স্ক্যাটারিং নামে পরিচিত। ঠিক এই কারণেই আকাশ নীল দেখায়। ফোটোনিক গ্লাসে এই অতিরিক্ত নীল আলো রঙের বিশুদ্ধতা নষ্ট করে দিত, বিশেষ করে লাল রংকে ফিকে ও মলিন করে তুলত।

এই সমস্যা সমাধানে গবেষকরা ২৩০ ন্যানোমিটার আকারের বিশেষ কোর-শেল ন্যানোকণা তৈরি করেন। এর কেন্দ্রে ছিল মাত্র ২০ ন্যানোমিটারের সোনার কণা এবং বাইরে সিলিকা আবরণ। সোনা ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে নেয়, ফলে অবাঞ্ছিত নীল আলো কমে যায়।

এরপর এইসব ন্যানোকণাকে একটি স্বচ্ছ আলোক-পরিচর্যার যোগ্য (ফটোকিউরেবল) রজনে মিশিয়ে বিভিন্ন পৃষ্ঠে প্রয়োগ করে অতিবেগুনি আলো দিয়ে শক্ত করা হয়। দেখা গেল এ অবস্থায় উপাদানটি এলোমেলোভাবে লাল আলো ছড়িয়ে দেয়, কিন্তু ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে ফেলে। ফলে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও বিশুদ্ধ লাল রং পাওয়া যায়।

গবেষকরা আরও দেখেছেন যে সিলিকা আচ্ছাদনের আকার ছোট করলে কণাগুলো আরও ঘনভাবে সাজানো যায়। এতে প্রথমে সবুজ এবং পরে গাঢ় নীল রং তৈরি হয়। নীল রঙের ক্ষেত্রেও স্বর্ণ কেন্দ্রকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ । এটি অপ্রয়োজনীয় বিচ্ছুরিত আলো কমিয়ে রঙের স্বচ্ছতা ও উজ্জ্বলতা বাড়ায়। অন্যথায় উপাদানটি সাদা বা দুধের মতো ঘোলাটে দেখাতে পারত।

এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা অনেক। গবেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে অত্যন্ত টেকসই ও হালকা ওজনের রঙিন আচ্ছাদন (কোটিং) তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া ন্যানোস্কেল গঠনের কারণে এখানে প্রতিটি উপাদানের নিজস্ব আলোক-স্বাক্ষর থাকবে, যা নকল করা কঠিন। ফলে জালিয়াতি প্রতিরোধী নিরাপত্তা প্রযুক্তিতেও এর প্রয়োগ হতে পারে।

যদিও সোনা ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু পুরো ফিল্মের ওজনের মাত্র ০.০২২ শতাংশ সোনা। তাই ব্যয় খুব বেশি নয়। ভবিষ্যতে আরও সস্তা ধাতু ব্যবহার করা গেলে প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে আরও লাভজনক হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রাকচারাল কালার নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা চললেও এই নতুন ফোটোনিক গ্লাস বাস্তব শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উদ্ভাবনগুলোর একটি । বিশেষ করে বিমান ও মহাকাশ শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে, যেখানে হালকা ও দীর্ঘস্থায়ী আচ্ছাদনের প্রয়োজন, সেখানে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

 

সূত্র: physics world

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − five =